ফিলিস্তিন ইস্যুতে বদলে যাচ্ছে মিশিগানের আরব-আমেরিকান ভোটের সমীকরণ, ইসরাইলপন্থী প্রার্থীদের আর সমর্থন দিতে রাজি নন ভোটাররা
- প্রকাশঃ ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪২
- / 9
ওয়াশিংটন, ৪ আগস্ট ২০২৬ (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আরব-আমেরিকান ভোটারদের একটি বড় অংশ বলছেন, ফিলিস্তিন ইস্যু এখন তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে সমর্থন না দেওয়া অনেক ভোটার জানিয়েছেন, ভবিষ্যতেও তারা এমন কোনো প্রার্থীকে ভোট দেবেন না, যিনি ইসরাইলপন্থী অবস্থান নেন।
ইয়েমেনি-আমেরিকান অধিকারকর্মী সামরা লুকমান আল জাজিরাকে বলেন, ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দেওয়ার বিষয়ে তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই। তাঁর ভাষ্য, ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি ও অভিবাসনবিরোধী অবস্থান আরব-আমেরিকানদের হতাশ করেছে। তবু গাজায় চলমান যুদ্ধের সময় ডেমোক্র্যাটদের জবাবদিহির আওতায় আনতে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
লুকমান বলেন, গাজায় সংঘটিত ঘটনাগুলোর জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তারা কঠিন একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ট্রাম্পের আরও চার বছর ক্ষমতায় থাকার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কেও তারা আগে থেকেই সচেতন ছিলেন।
ডেট্রয়েট এলাকার রাজনৈতিক কৌশলবিদ হুসেইন দাবাজেহ বলেন, ২০২৪ সালে কমলা হ্যারিসকে সমর্থনের আহ্বান জানানো তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাঁর মতে, দুই খারাপ বিকল্পের মধ্যে কম ক্ষতিকরকে বেছে নেওয়ার পুরোনো রাজনৈতিক যুক্তি এখন আর আরব ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন গাজায় যুদ্ধবিরতির দাবিতে সাড়া না দেওয়া এবং ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পর থেকেই আরব-আমেরিকানদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। পরে কমলা হ্যারিসও ইসরাইলের জন্য অস্ত্র সরবরাহে নিষেধাজ্ঞার দাবি বিবেচনায় নিতে অস্বীকৃতি জানান।
এর ফলে বহু আরব-আমেরিকান ভোটার, যারা দীর্ঘদিন ধরে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করে আসছিলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। নির্বাচনি প্রচারে ট্রাম্প নিজেকে শান্তির প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেন এবং মিশিগানের আরব ও মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। নির্বাচনের আগে তিনি আরব অধ্যুষিত ডিয়ারবর্ন শহরও সফর করেন।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পূর্ব ডিয়ারবর্নের আরব অধ্যুষিত ভোটকেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট পান ট্রাম্প। গ্রিন পার্টির প্রার্থী জিল স্টেইন পান ২৯ শতাংশ এবং কমলা হ্যারিস পান ১৬ শতাংশ ভোট। তবে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প গাজা ও লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার সুযোগ দেন। পাশাপাশি তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন, যার প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। দেশে ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থী কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ইয়েমেনি নাগরিকদের অভিবাসন সুরক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তও আরব-আমেরিকানদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
দাবাজেহ বলেন, বর্তমানে আরব ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁর মতে, সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষই প্রেসিডেন্টের বর্তমান নীতিতে অসন্তুষ্ট। ডিয়ারবর্ন শিক্ষা বোর্ডের সদস্য ও কৌতুকশিল্পী আমের জাহর বলেন, ট্রাম্পের নীতির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আরব-আমেরিকানদের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। তিনি ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মুসলিমপ্রধান কয়েকটি দেশের ওপর আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কথাও স্মরণ করেন।
তাঁর ভাষ্য, গাজার যুদ্ধ আরব-আমেরিকানদের রাজনৈতিকভাবে নতুন উপলব্ধি দিয়েছে। এখন তারা প্রয়োজন হলে রাজনৈতিক দলকে ‘না’ বলতে প্রস্তুত। এবারের নির্বাচনী মৌসুমে মিশিগানের আরব-আমেরিকানদের বড় একটি অংশ ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। তিনি অতীতে কমলা হ্যারিসকে সমর্থন করলেও বর্তমানে ইসরাইলের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত। কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিবের প্রতিও সম্প্রদায়ের সমর্থন রয়েছে।
লুকমান বলেন, ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন দলটির প্রতি আরব ভোটারদের আস্থা কিছুটা ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এখন তাদের কাছে একটি লাল রেখা। তিনি বলেন, কোনো প্রার্থী রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট যেই হোন না কেন, যদি তিনি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেন এবং আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (AIPAC)-এর প্রভাবের বিরোধিতা করেন, তাহলে তিনি আরব-আমেরিকান ভোটারদের সমর্থন পেতে পারেন।
আমের জাহরও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, মানুষ আর ফিলিস্তিন প্রশ্নকে উপেক্ষা করে অন্য ইস্যুতে ভোট দিতে রাজি নয়। গাজার শিশুদের রক্তের মূল্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন। দাবাজেহ বলেন, অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অবকাঠামো আরব ভোটারদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরিবারের সদস্যরা যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবের মুখে রয়েছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইলনীতি উপেক্ষা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
এদিকে ২০২৪ সালে আরব ও মুসলিম ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে রিপাবলিকানদের একাংশ আবারও মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যে ফিরে গেছে। ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর ফ্লোরিডার বিতর্কিত রাজনীতিক র্যান্ডি ফাইনকে কংগ্রেস নির্বাচনে সমর্থন দেন। অতীতে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য দেওয়া ফাইন পরে সব মুসলিমকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে ফ্লোরিডা ও টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নররা কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (CAIR)-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। মিশিগানে গভর্নর পদপ্রার্থী রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান জন জেমসও সংগঠনটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার অঙ্গীকার করেছেন।লুকমান বলেন, রিপাবলিকান পার্টির সামনে আরব-আমেরিকান ভোটারদের দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের দিকে টানার সুযোগ ছিল। তবে সাম্প্রতিক অবস্থানের কারণে তারা সেই সুযোগ হারিয়েছে।
























