ঢাকা ০৪:২৩ , Mon, ২৪ Aug ২০২৬

জীবিকার তাগিদে কাজ করতে গিয়ে আমেরিকায় একের পর এক হামলার শিকার বাংলাদেশি অভিবাসীরা

নিউইয়র্ক প্রতিনিধি
  • প্রকাশঃ ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:২২
  • / 1
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অভিবাসীদের কর্মক্ষেত্র ও চলাচলের সময় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ছবি: কোলাজ- প্রজন্ম কথা

যুক্তরাষ্ট্র, ২৪ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – আমেরিকায় জীবিকার জন্য কাজ করতে গিয়ে চলতি বছর একাধিক বাংলাদেশি অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন বা গুরুতর আহত হয়েছেন। ফ্লোরিডায় গ্যাস স্টেশনে কর্মরত নিলুফা ইয়াসমিনের মৃত্যু, পেনসিলভানিয়ায় খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে মো. মাহফুজুল হকের গুলিতে নিহত হওয়া এবং নিউইয়র্কে রাইড শেয়ার চালক রুহুল আমিন নাসিরের গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সর্বশেষ ব্রুকলিনের একটি রেস্তোরাঁয় দুই কর্মীর ওপর গুলির ঘটনায় আবারও বাংলাদেশি প্রবাসীদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনাগুলো ভিন্ন রাজ্য ও ভিন্ন পরিস্থিতিতে ঘটলেও কয়েকটি ঘটনায় একটি মিল স্পষ্ট। আক্রান্ত ব্যক্তিরা জীবিকার প্রয়োজনে কর্মস্থলে ছিলেন বা কাজের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে কর্মক্ষেত্র ও চলাচলের সময় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ফ্লোরিডার ফোর্ট মায়ার্সে গত ৩ এপ্রিল গ্যাস স্টেশনে কর্মরত বাংলাদেশি নারী নিলুফা ইয়াসমিন হামলায় নিহত হন। স্থানীয় প্রতিবেদনে তাঁর বয়স ৫১ বছর এবং তিনি দুই কন্যার মা ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্যক্তি হামলার আগে তাঁর গাড়ির ক্ষতি করেন এবং পরে বাইরে এসে নিলুফাকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন। আদালতে তদন্তকারীরা দাবি করেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিলুফাকে লক্ষ্য করেই সেখানে গিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে।

এরপর পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় খাবার পৌঁছে দেওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন ৪৩ বছর বয়সী মো. মাহফুজুল হক। ৭ জুলাই রাতে কিংসেসিং এলাকায় সাউথ ইথান স্ট্রিটের ১০০০ ব্লকে পুলিশ তাঁকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে। তাঁর মাথার পেছনে গুলি লাগে এবং পাশে তাঁর গাড়ির ইঞ্জিন চালু ছিল। ঘটনাস্থলে খাবার সরবরাহের ব্যাগও পাওয়া যায়।

মাহফুজুলের বাড়ি রাজশাহীতে। তিনি স্ত্রী ও ১৪ বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে ফিলাডেলফিয়ায় থাকতেন। পরে তদন্তের অগ্রগতিতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে তাঁর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে তাঁর বিচার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

মাহফুজুলের মৃত্যুর ঘটনায় আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। তিনি পেশায় চিকিৎসক ছিলেন এবং পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন ও স্ত্রীর পেশাগত জীবনে সহায়তার জন্য খাবার সরবরাহের কাজ করছিলেন বলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নিউইয়র্কেও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি চালকের ওপর গুলির ঘটনা ঘটেছে। ২৪ জুলাই ভোরে ব্রুকলিনে রুহুল আমিন নাসির নামে ৫৩ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি ট্যাক্সিচালক গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পর সামান্য সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধের মধ্যে তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় কাছাকাছি একটি বাড়ি থেকে এক ব্যক্তি বের হয়ে তাঁকে গুলি করেন। মুখে গুলিবিদ্ধ নাসিরকে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর অস্ত্রোপচার হয় এবং পরে তিনি স্থিতিশীল অবস্থায় ছিলেন।

এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ব্রুকলিনের ব্রাউনসভিল এলাকায় আরেকটি গুলির ঘটনা ঘটে। ২৩ আগস্ট মধ্যরাতে আমেরিকান বেস্ট উইংস অ্যান্ড পিজ্জা রেস্তোরাঁয় গুলিতে একজন নিহত এবং আরেকজন আহত হন। নিউইয়র্ক পুলিশ জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তির বয়স ৪৪ বছর এবং তাঁর মাথায় গুলি লাগে। আহত ৩৯ বছর বয়সী আরেক ব্যক্তির পায়ে গুলি লাগে। দুজনকেই হাসপাতালে নেওয়া হয়। নিহত ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি এবং ঘটনার তদন্ত চলছিল।

এই ঘটনাটি বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করছেন। তবে নিহত ও আহত ব্যক্তির বাংলাদেশি পরিচয় এবং তাঁদের নাম প্রকাশের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক তথ্য না আসা পর্যন্ত তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তাই এ ঘটনায় বাংলাদেশি কমিউনিটিকে লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে, এমন কোনো সিদ্ধান্তেও এখনই পৌঁছানো যাচ্ছে না।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের কর্মজীবনের ধরন বিবেচনায় নিরাপত্তার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রবাসী রেস্তোরাঁ, গ্যাস স্টেশন, খাবার সরবরাহ, ট্যাক্সি ও রাইড শেয়ার, ছোট ব্যবসা এবং অন্যান্য সেবামূলক পেশায় কাজ করেন। এসব কাজের ক্ষেত্রে গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকা, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং নগদ অর্থ বা পণ্য পরিবহনের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

রাইড শেয়ার চালক ফাহাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশি অভিবাসীদের বড় একটি অংশ জীবিকার প্রয়োজনে এমন পেশায় যুক্ত, যেখানে নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে। রেস্তোরাঁ, গ্যাস স্টেশন, খাবার সরবরাহ কিংবা রাইড শেয়ারের কাজের ধরন ভিন্ন হলেও অনেকের কাজের সময় ও পরিবেশে ঝুঁকির মিল রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ফাহাদের মতে, কোনো বাংলাদেশি নিহত বা আহত হওয়ার পর কমিউনিটিতে কিছুদিন আলোচনা ও প্রতিবাদ হলেও অনেক সময় বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি দাবিতে রূপ নেয় না। স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছেও ধারাবাহিকভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

খাবার সরবরাহের কাজে যুক্ত মোহাম্মদ শিরিল হাসানও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, জীবিকার জন্য বাইরে বের হওয়া একজন প্রবাসী যদি প্রতিদিন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকেন, তাহলে বিষয়টি কমিউনিটি ও প্রশাসন উভয়ের গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও কমিউনিটি নেতাদের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। কর্মস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, রাতের শিফটে কর্মরত ব্যক্তিরা বিপদের সময় কত দ্রুত পুলিশের সহায়তা পান, রাইড শেয়ার ও ডেলিভারি কর্মীদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং কোনো বাংলাদেশি হামলার শিকার হলে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া কতটা নিয়মিতভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে, সেসব বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষ করে নিউইয়র্ক, পেনসিলভানিয়া ও ফ্লোরিডার মতো অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির সংগঠনগুলো স্থানীয় পুলিশ, সিটি প্রশাসন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়াতে পারে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজের সময় সতর্কতা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে কোনো বাংলাদেশি নিহত বা আহত হলে তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়েও ধারাবাহিক ভূমিকা প্রয়োজন।

ফ্লোরিডায় নিলুফা ইয়াসমিন কর্মস্থলে ছিলেন। ফিলাডেলফিয়ায় মাহফুজুল হক খাবার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। নিউইয়র্কে রুহুল আমিন নাসির ছিলেন যাত্রী পরিবহনের কাজে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রবাসীদের নিরাপত্তা প্রশ্নটি অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের দৈনন্দিন জীবিকা ও কর্মপরিবেশের সঙ্গেই সরাসরি যুক্ত।

একেকটি ঘটনার পর শোক ও প্রতিবাদ গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রবাসীদের প্রত্যাশা, কোনো প্রাণহানির পর কয়েক দিনের আলোচনায় বিষয়টি থেমে না থেকে তদন্ত, বিচার এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানোর কার্যকর পদক্ষেপের দিকে এগোবে।

❤️
👏
🙂
😞

জীবিকার তাগিদে কাজ করতে গিয়ে আমেরিকায় একের পর এক হামলার শিকার বাংলাদেশি অভিবাসীরা

প্রকাশঃ ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:২২

যুক্তরাষ্ট্র, ২৪ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – আমেরিকায় জীবিকার জন্য কাজ করতে গিয়ে চলতি বছর একাধিক বাংলাদেশি অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন বা গুরুতর আহত হয়েছেন। ফ্লোরিডায় গ্যাস স্টেশনে কর্মরত নিলুফা ইয়াসমিনের মৃত্যু, পেনসিলভানিয়ায় খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে মো. মাহফুজুল হকের গুলিতে নিহত হওয়া এবং নিউইয়র্কে রাইড শেয়ার চালক রুহুল আমিন নাসিরের গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সর্বশেষ ব্রুকলিনের একটি রেস্তোরাঁয় দুই কর্মীর ওপর গুলির ঘটনায় আবারও বাংলাদেশি প্রবাসীদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনাগুলো ভিন্ন রাজ্য ও ভিন্ন পরিস্থিতিতে ঘটলেও কয়েকটি ঘটনায় একটি মিল স্পষ্ট। আক্রান্ত ব্যক্তিরা জীবিকার প্রয়োজনে কর্মস্থলে ছিলেন বা কাজের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে কর্মক্ষেত্র ও চলাচলের সময় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ফ্লোরিডার ফোর্ট মায়ার্সে গত ৩ এপ্রিল গ্যাস স্টেশনে কর্মরত বাংলাদেশি নারী নিলুফা ইয়াসমিন হামলায় নিহত হন। স্থানীয় প্রতিবেদনে তাঁর বয়স ৫১ বছর এবং তিনি দুই কন্যার মা ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্যক্তি হামলার আগে তাঁর গাড়ির ক্ষতি করেন এবং পরে বাইরে এসে নিলুফাকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন। আদালতে তদন্তকারীরা দাবি করেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিলুফাকে লক্ষ্য করেই সেখানে গিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে।

এরপর পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় খাবার পৌঁছে দেওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন ৪৩ বছর বয়সী মো. মাহফুজুল হক। ৭ জুলাই রাতে কিংসেসিং এলাকায় সাউথ ইথান স্ট্রিটের ১০০০ ব্লকে পুলিশ তাঁকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে। তাঁর মাথার পেছনে গুলি লাগে এবং পাশে তাঁর গাড়ির ইঞ্জিন চালু ছিল। ঘটনাস্থলে খাবার সরবরাহের ব্যাগও পাওয়া যায়।

মাহফুজুলের বাড়ি রাজশাহীতে। তিনি স্ত্রী ও ১৪ বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে ফিলাডেলফিয়ায় থাকতেন। পরে তদন্তের অগ্রগতিতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে তাঁর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে তাঁর বিচার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

মাহফুজুলের মৃত্যুর ঘটনায় আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। তিনি পেশায় চিকিৎসক ছিলেন এবং পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন ও স্ত্রীর পেশাগত জীবনে সহায়তার জন্য খাবার সরবরাহের কাজ করছিলেন বলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নিউইয়র্কেও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি চালকের ওপর গুলির ঘটনা ঘটেছে। ২৪ জুলাই ভোরে ব্রুকলিনে রুহুল আমিন নাসির নামে ৫৩ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি ট্যাক্সিচালক গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পর সামান্য সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধের মধ্যে তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় কাছাকাছি একটি বাড়ি থেকে এক ব্যক্তি বের হয়ে তাঁকে গুলি করেন। মুখে গুলিবিদ্ধ নাসিরকে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর অস্ত্রোপচার হয় এবং পরে তিনি স্থিতিশীল অবস্থায় ছিলেন।

এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ব্রুকলিনের ব্রাউনসভিল এলাকায় আরেকটি গুলির ঘটনা ঘটে। ২৩ আগস্ট মধ্যরাতে আমেরিকান বেস্ট উইংস অ্যান্ড পিজ্জা রেস্তোরাঁয় গুলিতে একজন নিহত এবং আরেকজন আহত হন। নিউইয়র্ক পুলিশ জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তির বয়স ৪৪ বছর এবং তাঁর মাথায় গুলি লাগে। আহত ৩৯ বছর বয়সী আরেক ব্যক্তির পায়ে গুলি লাগে। দুজনকেই হাসপাতালে নেওয়া হয়। নিহত ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি এবং ঘটনার তদন্ত চলছিল।

এই ঘটনাটি বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করছেন। তবে নিহত ও আহত ব্যক্তির বাংলাদেশি পরিচয় এবং তাঁদের নাম প্রকাশের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক তথ্য না আসা পর্যন্ত তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তাই এ ঘটনায় বাংলাদেশি কমিউনিটিকে লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে, এমন কোনো সিদ্ধান্তেও এখনই পৌঁছানো যাচ্ছে না।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের কর্মজীবনের ধরন বিবেচনায় নিরাপত্তার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রবাসী রেস্তোরাঁ, গ্যাস স্টেশন, খাবার সরবরাহ, ট্যাক্সি ও রাইড শেয়ার, ছোট ব্যবসা এবং অন্যান্য সেবামূলক পেশায় কাজ করেন। এসব কাজের ক্ষেত্রে গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকা, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং নগদ অর্থ বা পণ্য পরিবহনের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

রাইড শেয়ার চালক ফাহাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশি অভিবাসীদের বড় একটি অংশ জীবিকার প্রয়োজনে এমন পেশায় যুক্ত, যেখানে নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে। রেস্তোরাঁ, গ্যাস স্টেশন, খাবার সরবরাহ কিংবা রাইড শেয়ারের কাজের ধরন ভিন্ন হলেও অনেকের কাজের সময় ও পরিবেশে ঝুঁকির মিল রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ফাহাদের মতে, কোনো বাংলাদেশি নিহত বা আহত হওয়ার পর কমিউনিটিতে কিছুদিন আলোচনা ও প্রতিবাদ হলেও অনেক সময় বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি দাবিতে রূপ নেয় না। স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছেও ধারাবাহিকভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

খাবার সরবরাহের কাজে যুক্ত মোহাম্মদ শিরিল হাসানও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, জীবিকার জন্য বাইরে বের হওয়া একজন প্রবাসী যদি প্রতিদিন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকেন, তাহলে বিষয়টি কমিউনিটি ও প্রশাসন উভয়ের গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও কমিউনিটি নেতাদের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। কর্মস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, রাতের শিফটে কর্মরত ব্যক্তিরা বিপদের সময় কত দ্রুত পুলিশের সহায়তা পান, রাইড শেয়ার ও ডেলিভারি কর্মীদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং কোনো বাংলাদেশি হামলার শিকার হলে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া কতটা নিয়মিতভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে, সেসব বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষ করে নিউইয়র্ক, পেনসিলভানিয়া ও ফ্লোরিডার মতো অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির সংগঠনগুলো স্থানীয় পুলিশ, সিটি প্রশাসন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়াতে পারে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজের সময় সতর্কতা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে কোনো বাংলাদেশি নিহত বা আহত হলে তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়েও ধারাবাহিক ভূমিকা প্রয়োজন।

ফ্লোরিডায় নিলুফা ইয়াসমিন কর্মস্থলে ছিলেন। ফিলাডেলফিয়ায় মাহফুজুল হক খাবার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। নিউইয়র্কে রুহুল আমিন নাসির ছিলেন যাত্রী পরিবহনের কাজে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রবাসীদের নিরাপত্তা প্রশ্নটি অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের দৈনন্দিন জীবিকা ও কর্মপরিবেশের সঙ্গেই সরাসরি যুক্ত।

একেকটি ঘটনার পর শোক ও প্রতিবাদ গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রবাসীদের প্রত্যাশা, কোনো প্রাণহানির পর কয়েক দিনের আলোচনায় বিষয়টি থেমে না থেকে তদন্ত, বিচার এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানোর কার্যকর পদক্ষেপের দিকে এগোবে।