বুয়েট থেকে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়: যে বাংলাদেশির অ্যালগরিদমে সুরক্ষিত মার্কিন সেনাবাহিনী ও নাসার বিগ ডেটা সেন্টার
- প্রকাশঃ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৪
- / 10
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে পড়াশোনা করে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অধ্যাপনা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরি করেছেন অধ্যাপক ড. লতিফুর খান। বিগ ডেটা, ডেটা মাইনিং, সাইবার নিরাপত্তা ও জটিল ডেটা ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁর গবেষণা যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি গবেষণা সংস্থার প্রকল্প ও অর্থায়নের সঙ্গে। তাঁর গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সেনাবাহিনী ও নাসার বিগ ডেটা সুরক্ষায়ও তাঁর অ্যালগরিদম ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক সম্পন্ন করেন লতিফুর খান। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ১৯৯৬ সালে স্নাতকোত্তর এবং ২০০০ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
পিএইচডি শেষ করার বছরই তিনি যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট ডালাসের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি সেখানে পূর্ণ অধ্যাপক এবং বিগ ডেটা অ্যানালিটিকস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ল্যাবের পরিচালক।
লতিফুর খানের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র বিগ ডেটা ব্যবস্থাপনা ও বিশ্লেষণ, ডেটা মাইনিং, সাইবার নিরাপত্তা এবং জটিল ডেটা ব্যবস্থাপনা। জিওস্পেশিয়াল ডেটা, মাল্টিমিডিয়া ডেটা, সেমান্টিক ওয়েব এবং ম্যালওয়্যার শনাক্তকরণ নিয়েও তাঁর গবেষণা রয়েছে।
ডেটা মাইনিংয়ের মাধ্যমে ম্যালওয়্যার শনাক্তকরণ, ডেটা স্ট্রিম বিশ্লেষণ এবং নিরাপদ তথ্য ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রেও তিনি দীর্ঘদিন কাজ করছেন। বড় পরিসরের তথ্যকে বিশ্লেষণ করে সেখান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বের করা এবং সাইবার নিরাপত্তায় তা কাজে লাগানো তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাঁর গবেষণা ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন, এয়ার ফোর্স অফিস অব সায়েন্টিফিক রিসার্চ, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ, আইবিএম ও এইচপিইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন পেয়েছে। নাসার অর্থায়নেও তাঁর গবেষণা পরিচালিত হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত এসব গবেষণার কারণে তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বড় পরিসরের তথ্য বিশ্লেষণ, নিরাপত্তা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। এ কারণেই তাঁর গবেষণাকে ঘিরে মার্কিন সেনাবাহিনী ও নাসার বিগ ডেটা সুরক্ষায় তাঁর অ্যালগরিদম ব্যবহারের তথ্যও সামনে এসেছে।
দীর্ঘ গবেষণাজীবনে লতিফুর খান ৩০০টির বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জার্নাল ও সম্মেলনে তাঁর গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। বিগ ডেটা, ডেটা মাইনিং, সাইবার নিরাপত্তা এবং জটিল ডেটা ব্যবস্থাপনা তাঁর গবেষণার প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে।
তাঁর গবেষণার পরিধি শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার থেকে কার্যকর তথ্য বের করা, বিভিন্ন ধরনের জটিল তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি শনাক্ত করার মতো বিষয়ও তাঁর গবেষণার অন্তর্ভুক্ত।
গবেষণায় অবদানের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান থেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন লতিফুর খান। তিনি আইইইই, আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স, ব্রিটিশ কম্পিউটার সোসাইটি এবং ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির ফেলো। পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্পিউটিং মেশিনারির ডিস্টিংগুইশড সায়েন্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
তাঁর পাওয়া পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে আইইইই টেকনিক্যাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, আইইইই বিগ ডেটা সিকিউরিটি অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৬ সালের আইবিএম ফ্যাকাল্টি অ্যাওয়ার্ড। এসব স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘ গবেষণাকর্মের আন্তর্জাতিক পরিসরকে তুলে ধরে।
গবেষণার পাশাপাশি লতিফুর খান একাধিক বইও লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘ডেটা মাইনিং টুলস ফর ম্যালওয়্যার ডিটেকশন’, ‘বিগ ডেটা অ্যানালিটিকস উইথ অ্যাপ্লিকেশনস ইন ইনসাইডার থ্রেট ডিটেকশন’ এবং ‘অ্যানালাইজিং অ্যান্ড সিকিউরিং সোশ্যাল নেটওয়ার্কস’।
এসব বইয়ের বিষয়বস্তুতেও তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্রগুলো প্রতিফলিত হয়েছে। ম্যালওয়্যার শনাক্তকরণ, বিগ ডেটা বিশ্লেষণ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য নিরাপত্তা তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে বুয়েটের শিক্ষার্থী হিসেবে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা পরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ অধ্যাপনা ও গবেষণার পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০০০ সাল থেকে ইউটি ডালাসে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থেকে লতিফুর খান বিগ ডেটা ও সাইবার নিরাপত্তার মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছেন।
বাংলাদেশ থেকে শুরু হওয়া তাঁর এই পেশাগত পথচলায় শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আর সেই গবেষণার ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে বিগ ডেটা ব্যবস্থাপনা থেকে সাইবার নিরাপত্তা, ম্যালওয়্যার শনাক্তকরণ থেকে জিওস্পেশিয়াল ডেটা বিশ্লেষণ পর্যন্ত।



























