ঢাকা ১১:১৯ , Sat, ২৬ Sep ২০২৬
বিশ্বসমাচার
এশিয়া

বিদেশিদের জন্য জাপানে স্থায়ী বসবাসের নিয়মে কড়াকড়ি, অনিশ্চয়তায় দীর্ঘদিনের অভিবাসীরা

এ্যানী রহমান
  • প্রকাশঃ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৮
  • / 10
জাপানের টোকিওতে অভিবাসনসংক্রান্ত কার্যালয়। নতুন নিয়মে স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের জন্য বিভিন্ন শর্ত কঠোর করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

টোকিও, ২৬ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – বিদেশিদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেওয়ার নিয়ম কঠোর করছে জাপান। নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীদের পারিবারিক আয়, ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধা, জাপানি ভাষাজ্ঞান ও দেশটির সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে বোঝাপড়ার মতো বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পাবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বসবাস ও কাজ করা অনেক বিদেশি তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সংশোধিত নির্দেশনায় স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের নিজস্ব ও পারিবারিকভাবে স্বনির্ভর জীবনযাপনের সক্ষমতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নতুন আয়সংক্রান্ত মানদণ্ড ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর ক্ষেত্রেও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য কিছু শর্ত ধাপে ধাপে পরবর্তী সময়ে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশি প্রযুক্তি প্রকৌশলী আবদুল প্রায় আট বছর আগে কাজের জন্য জাপানে যান। উত্তর টোকিওতে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাসকারী আবদুলের কাছে এখন জাপান তাঁর জন্মভূমি বাংলাদেশের চেয়েও পরিচিত হয়ে উঠেছে। তবে স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্বের আবেদন নিয়ে নতুন নিয়মের কারণে তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

নিজের প্রকৃত নাম প্রকাশ না করার শর্তে আবদুল বলেন, জাপান সরকার ভবিষ্যতে আরও কঠোর কোনো নিয়ম চালু করবে কি না, তা তিনি জানেন না। তাঁর আশঙ্কা, স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্বের আবেদন দুটিই প্রত্যাখ্যাত হলে তাঁকে জাপানের বাইরে কাজের সুযোগ খুঁজতে হতে পারে।

নতুন ব্যবস্থায় স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের আয় সংশ্লিষ্ট পরিবারের আকার অনুযায়ী জাপানি পরিবারের গড় আয়ের চেয়ে বেশি হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে আবেদনকারীর ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধা নির্দিষ্ট একটি মানে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও মূল্যায়নের অংশ হবে। এই মানদণ্ডে একই আয়ের স্তরে ৩০ বছর কর্মী পেনশন ব্যবস্থায় অবদান রাখলে যে পরিমাণ পেনশন পাওয়ার কথা, তা তুলনার ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে। তবে পেনশন সুবিধার ঘাটতি থাকলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সম্পদ দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণের সুযোগ থাকার কথা খসড়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে।

এ ছাড়া জাপানি ভাষায় দক্ষতা, জাপানের আইন ও সামাজিক ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান এবং দেশটিতে বসবাসরত বিদেশিদের স্থানীয় সমাজে সম্পৃক্ততার বিষয়গুলোও স্থায়ী বসবাসের আবেদন মূল্যায়নে গুরুত্ব পাবে। স্কুলে যাওয়ার বয়সী সন্তান থাকলে তারা বাধ্যতামূলক শিক্ষা গ্রহণ করছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জাপানে গত কয়েক বছর ধরে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৩৯৫, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি এবং প্রথমবারের মতো ৪০ লাখ ছাড়িয়েছে।

এই পরিবর্তনের মধ্যে জাপানে বিদেশিদের গ্রহণ নিয়ে জনমতও বদলেছে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা আরও বেশি বিদেশি গ্রহণের বিরোধিতা করেছেন। ২০২৪ সালের একই জরিপে এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিক সারাহ নেলকিনও নতুন নিয়ম নিয়ে উদ্বিগ্ন। ১৪ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে জাপানে যাওয়া নেলকিন বর্তমানে দেশটির বিনোদন শিল্পে কাজ করছেন। নতুন নিয়ম ঘোষণার কিছুদিন আগে তিনি স্থায়ী বসবাসের আবেদন করেছিলেন।

আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে জাপানের নাগরিকত্ব নেওয়ার কথা ভাবছেন নেলকিন। তবে এর ক্ষেত্রে তাঁকে মার্কিন নাগরিকত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। জাপানের আইন অনুযায়ী, সাধারণভাবে একাধিক নাগরিকত্ব থাকা ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি নাগরিকত্ব বেছে নিতে হয় এবং নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্বের নাগরিকত্ব ত্যাগের শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে।

নেলকিন বলেন, তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের পুরোটা জাপানে কেটেছে। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও পারিবারিক কারণে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব ধরে রাখতে চান। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁকে হয়তো নিজের মার্কিন নাগরিকত্ব নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

মেইকাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রিসা হাগিওয়ারার মতে, নতুন পরিবর্তনগুলো জাপানের অভিবাসননীতিকে আরও বাছাইভিত্তিক ও শর্তনির্ভর করার প্রবণতা দেখাচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, জনসংখ্যা কমে যাওয়া ও শ্রমিক সংকটের কারণে জাপানের বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের শর্ত কঠিন হলে দেশটি বিদেশি কর্মীদের কাছে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

হাগিওয়ারা বলেন, বিদেশি কর্মীদের মাধ্যমে শ্রমিক সংকট মোকাবিলা করতে চাইলে তাঁদের জাপানে আসার পর কী হবে, সেই প্রশ্নও বিবেচনায় নিতে হবে। তাঁর মতে, আলোচনার বিষয় এখন শুধু জাপানের কত বিদেশি কর্মী প্রয়োজন তা নয়, বিদেশিদের সঙ্গে জাপান কী ধরনের সমাজ গড়ে তুলতে চায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

জাপানে অভিবাসন নিয়ে এই পরিবর্তন দেশটির রাজনীতিতে বিদেশিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের আলোচনার মধ্যেও এসেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি গত বছর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের প্রচারের সময় ভিন্ন সংস্কৃতি ও পটভূমির মানুষকে গ্রহণসংক্রান্ত কিছু নীতি পুনর্বিবেচনার কথা বলেছিলেন। পরে তাঁর জাপান ইনোভেশন পার্টির সঙ্গে জোট চুক্তিতেও আইন ভঙ্গকারী বিদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং বিদেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য সামাজিক সমস্যার মোকাবিলার কথা উঠে আসে।

একই সময়ে অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত সানসেইতো দলও সাম্প্রতিক নির্বাচনে আগের তুলনায় বেশি আসন পেয়েছে। বিদেশিদের বিষয়ে জনমতের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক বিতর্কের এই প্রেক্ষাপটেই স্থায়ী বসবাসের নিয়ম কঠোর করার উদ্যোগটি সামনে এসেছে।

তবে জাপানের অর্থনীতিতে বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। দেশটির মোট জনসংখ্যা দীর্ঘদিন ধরে কমছে এবং শ্রমবাজারের বিভিন্ন খাতে কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিদেশিদের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুযোগ কঠোর করা এবং একই সঙ্গে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো, এই দুই প্রবণতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি জাপানের সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আবদুলের মতো দীর্ঘদিনের বিদেশি বাসিন্দাদের কাছে বিষয়টি এখন তাঁদের ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা করা অনেকের জন্য নতুন নিয়মের আওতায় নিজেদের যোগ্যতা পূরণ করতে পারবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

❤️
👏
🙂
😞

বিদেশিদের জন্য জাপানে স্থায়ী বসবাসের নিয়মে কড়াকড়ি, অনিশ্চয়তায় দীর্ঘদিনের অভিবাসীরা

প্রকাশঃ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৮

টোকিও, ২৬ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – বিদেশিদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেওয়ার নিয়ম কঠোর করছে জাপান। নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীদের পারিবারিক আয়, ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধা, জাপানি ভাষাজ্ঞান ও দেশটির সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে বোঝাপড়ার মতো বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পাবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বসবাস ও কাজ করা অনেক বিদেশি তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সংশোধিত নির্দেশনায় স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের নিজস্ব ও পারিবারিকভাবে স্বনির্ভর জীবনযাপনের সক্ষমতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নতুন আয়সংক্রান্ত মানদণ্ড ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর ক্ষেত্রেও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য কিছু শর্ত ধাপে ধাপে পরবর্তী সময়ে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশি প্রযুক্তি প্রকৌশলী আবদুল প্রায় আট বছর আগে কাজের জন্য জাপানে যান। উত্তর টোকিওতে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাসকারী আবদুলের কাছে এখন জাপান তাঁর জন্মভূমি বাংলাদেশের চেয়েও পরিচিত হয়ে উঠেছে। তবে স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্বের আবেদন নিয়ে নতুন নিয়মের কারণে তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

নিজের প্রকৃত নাম প্রকাশ না করার শর্তে আবদুল বলেন, জাপান সরকার ভবিষ্যতে আরও কঠোর কোনো নিয়ম চালু করবে কি না, তা তিনি জানেন না। তাঁর আশঙ্কা, স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্বের আবেদন দুটিই প্রত্যাখ্যাত হলে তাঁকে জাপানের বাইরে কাজের সুযোগ খুঁজতে হতে পারে।

নতুন ব্যবস্থায় স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের আয় সংশ্লিষ্ট পরিবারের আকার অনুযায়ী জাপানি পরিবারের গড় আয়ের চেয়ে বেশি হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে আবেদনকারীর ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধা নির্দিষ্ট একটি মানে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও মূল্যায়নের অংশ হবে। এই মানদণ্ডে একই আয়ের স্তরে ৩০ বছর কর্মী পেনশন ব্যবস্থায় অবদান রাখলে যে পরিমাণ পেনশন পাওয়ার কথা, তা তুলনার ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে। তবে পেনশন সুবিধার ঘাটতি থাকলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সম্পদ দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণের সুযোগ থাকার কথা খসড়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে।

এ ছাড়া জাপানি ভাষায় দক্ষতা, জাপানের আইন ও সামাজিক ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান এবং দেশটিতে বসবাসরত বিদেশিদের স্থানীয় সমাজে সম্পৃক্ততার বিষয়গুলোও স্থায়ী বসবাসের আবেদন মূল্যায়নে গুরুত্ব পাবে। স্কুলে যাওয়ার বয়সী সন্তান থাকলে তারা বাধ্যতামূলক শিক্ষা গ্রহণ করছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জাপানে গত কয়েক বছর ধরে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৩৯৫, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি এবং প্রথমবারের মতো ৪০ লাখ ছাড়িয়েছে।

এই পরিবর্তনের মধ্যে জাপানে বিদেশিদের গ্রহণ নিয়ে জনমতও বদলেছে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা আরও বেশি বিদেশি গ্রহণের বিরোধিতা করেছেন। ২০২৪ সালের একই জরিপে এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিক সারাহ নেলকিনও নতুন নিয়ম নিয়ে উদ্বিগ্ন। ১৪ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে জাপানে যাওয়া নেলকিন বর্তমানে দেশটির বিনোদন শিল্পে কাজ করছেন। নতুন নিয়ম ঘোষণার কিছুদিন আগে তিনি স্থায়ী বসবাসের আবেদন করেছিলেন।

আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে জাপানের নাগরিকত্ব নেওয়ার কথা ভাবছেন নেলকিন। তবে এর ক্ষেত্রে তাঁকে মার্কিন নাগরিকত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। জাপানের আইন অনুযায়ী, সাধারণভাবে একাধিক নাগরিকত্ব থাকা ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি নাগরিকত্ব বেছে নিতে হয় এবং নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্বের নাগরিকত্ব ত্যাগের শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে।

নেলকিন বলেন, তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের পুরোটা জাপানে কেটেছে। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও পারিবারিক কারণে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব ধরে রাখতে চান। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁকে হয়তো নিজের মার্কিন নাগরিকত্ব নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

মেইকাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রিসা হাগিওয়ারার মতে, নতুন পরিবর্তনগুলো জাপানের অভিবাসননীতিকে আরও বাছাইভিত্তিক ও শর্তনির্ভর করার প্রবণতা দেখাচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, জনসংখ্যা কমে যাওয়া ও শ্রমিক সংকটের কারণে জাপানের বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের শর্ত কঠিন হলে দেশটি বিদেশি কর্মীদের কাছে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

হাগিওয়ারা বলেন, বিদেশি কর্মীদের মাধ্যমে শ্রমিক সংকট মোকাবিলা করতে চাইলে তাঁদের জাপানে আসার পর কী হবে, সেই প্রশ্নও বিবেচনায় নিতে হবে। তাঁর মতে, আলোচনার বিষয় এখন শুধু জাপানের কত বিদেশি কর্মী প্রয়োজন তা নয়, বিদেশিদের সঙ্গে জাপান কী ধরনের সমাজ গড়ে তুলতে চায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

জাপানে অভিবাসন নিয়ে এই পরিবর্তন দেশটির রাজনীতিতে বিদেশিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের আলোচনার মধ্যেও এসেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি গত বছর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের প্রচারের সময় ভিন্ন সংস্কৃতি ও পটভূমির মানুষকে গ্রহণসংক্রান্ত কিছু নীতি পুনর্বিবেচনার কথা বলেছিলেন। পরে তাঁর জাপান ইনোভেশন পার্টির সঙ্গে জোট চুক্তিতেও আইন ভঙ্গকারী বিদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং বিদেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য সামাজিক সমস্যার মোকাবিলার কথা উঠে আসে।

একই সময়ে অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত সানসেইতো দলও সাম্প্রতিক নির্বাচনে আগের তুলনায় বেশি আসন পেয়েছে। বিদেশিদের বিষয়ে জনমতের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক বিতর্কের এই প্রেক্ষাপটেই স্থায়ী বসবাসের নিয়ম কঠোর করার উদ্যোগটি সামনে এসেছে।

তবে জাপানের অর্থনীতিতে বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। দেশটির মোট জনসংখ্যা দীর্ঘদিন ধরে কমছে এবং শ্রমবাজারের বিভিন্ন খাতে কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিদেশিদের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুযোগ কঠোর করা এবং একই সঙ্গে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো, এই দুই প্রবণতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি জাপানের সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আবদুলের মতো দীর্ঘদিনের বিদেশি বাসিন্দাদের কাছে বিষয়টি এখন তাঁদের ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা করা অনেকের জন্য নতুন নিয়মের আওতায় নিজেদের যোগ্যতা পূরণ করতে পারবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।