জার্মানির আকাশে ঝুলে চলা ১২৫ বছরের পুরোনো ট্রেনে আকাশপথে এক অনন্য যাত্রা
- প্রকাশঃ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:১৪
- / 5
ভুপারটাল, জার্মানি, (প্রজন্ম কথা) – পড়াশোনার উদ্দেশ্যে জার্মানিতে এসে অনেক জায়গা দেখার সুযোগ হয়েছে। তবে কিছু জায়গা আছে, যেগুলো শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং ইতিহাস, প্রকৌশল আর মানুষের উদ্ভাবনী চিন্তার জীবন্ত স্মারক। জার্মানির ভুপারটাল শহরের শ্বেবেবান তেমনই এক বিস্ময়।
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, কোনো কল্পবিজ্ঞানের সিনেমার দৃশ্য সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রেনটি প্রচলিত রেললাইনের ওপর চলছে না, বরং ইস্পাতের কাঠামোর সঙ্গে ঝুলে শহরের ওপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আরও বিস্ময়ের বিষয়, এই পরিবহনব্যবস্থা আধুনিক কোনো প্রযুক্তির ফল নয়। ১৯০১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রী পরিবহন শুরু করা এই ঝুলন্ত রেলপথ ২০২৬ সালে ১২৫ বছর পূর্ণ করেছে।
উনিশ শতকের শেষদিকে ভুপার উপত্যকায় শিল্পায়ন দ্রুত বাড়ছিল। বর্তমান নর্থ রাইন-ভেস্টফালিয়া রাজ্যের এলবারফেল্ড ও বারমেনসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে জনসংখ্যা ও শিল্পকারখানা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়তে থাকে।
ভুপার নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা শহরটির ভৌগোলিক অবস্থান ছিল বিশেষ ধরনের। সরু উপত্যকার দুই পাশে পাহাড়, মাঝ দিয়ে নদী এবং সীমিত নগরভূমির কারণে নতুন সড়ক নির্মাণ কিংবা প্রচলিত পথে বড় পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা সহজ ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে বিকল্প একটি ধারণা সামনে আসে। মাটির ওপর জায়গা না থাকলে পরিবহনব্যবস্থাকে নিয়ে যাওয়া যায় ওপরের স্তরে। জার্মান প্রকৌশলী অয়গেন ল্যাঙেনের নকশা ও পেটেন্টের ভিত্তিতে তৈরি হতে থাকে ঝুলন্ত রেলব্যবস্থা। ১৮৯৮ সালের গ্রীষ্মে শুরু হয় নির্মাণকাজ। একই বছরের ৫ ডিসেম্বর প্রথম পরীক্ষামূলক যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর আসে আরও একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
১৯০০ সালের ২৪ অক্টোবর জার্মান সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় ভিলহেল্ম তাঁর স্ত্রী অগুস্তে ভিক্টোরিয়াকে সঙ্গে নিয়ে এই রেলপথে পরীক্ষামূলক যাত্রা করেন। ড্যোপার্সবার্গ থেকে ফোহভিনকেল পর্যন্ত সেই যাত্রার পর ঐ বিশেষ রেলগাড়িটি ‘কাইজারভাগেন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
অবশেষে ১৯০১ সালের ১ মার্চ ক্লুজে থেকে চিড়িয়াখানা পর্যন্ত অংশ সাধারণ যাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এরপর ধাপে ধাপে বাকি অংশ চালু হয় এবং ১৯০৩ সালের ২৭ জুন পুরো রুটের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।
ইতিহাসটা জানার পর যখন নিজেই শ্বেবেবানে উঠলাম, অভিজ্ঞতাটা যেন আরও আলাদা হয়ে উঠল।
স্টেশনে দাঁড়িয়ে ট্রেনটির অপেক্ষা করছিলাম। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে একটি ট্রেন এগিয়ে আসতে দেখা গেল। কিন্তু নিচে প্রচলিত অর্থে কোনো রেললাইন নেই। ইস্পাতের কাঠামোর সঙ্গে ঝুলে থাকা ট্রেনটি ধীরে ধীরে স্টেশনের দিকে এগিয়ে এলো।
জার্মানি থেকে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, কমিউনিটি সংবাদসহ ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা- (ই-মেইল: projonmokothanews@gmail.com)
ট্রেনে উঠে জানালার পাশে বসতেই শুরু হলো অন্য রকম এক যাত্রা।
কিছুক্ষণ পর স্টেশন ছেড়ে ট্রেনটি এগিয়ে গেল। জানালার বাইরে কখনো ভুপার নদী, কখনো শহরের রাস্তা, কখনো পাহাড় আর ভবন চোখে পড়ছিল। নিচে মানুষ স্বাভাবিক গতিতে হাঁটছে, গাড়ি চলছে, শহরের দৈনন্দিন জীবন চলছে। আর তার ওপর দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি একটি শতাব্দীপ্রাচীন প্রযুক্তির ওপর ভর করে।
কখনো মনে হচ্ছিল নদীর ওপর দিয়ে ভেসে চলেছি, আবার কখনো শহরের রাস্তার ওপর দিয়ে। ট্রেনটির এই চলার ধরন প্রচলিত রেলভ্রমণের সঙ্গে একেবারেই আলাদা।
বর্তমানে ভুপারটাল শ্বেবেবানের পুরো রুটের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার। এর বড় অংশ ভুপার নদীর ওপর দিয়ে চলে। শহরের তথ্য অনুযায়ী, রেলপথটি জায়গাভেদে সড়কের প্রায় ৮ মিটার এবং নদীর প্রায় ১২ মিটার ওপরে অবস্থান করে। প্রতিদিন ৮৫ হাজারের বেশি যাত্রী এই পরিবহনব্যবস্থা ব্যবহার করেন।
দুই প্রান্তের ভোহভিনকেল ও ওবারবারমেনকে সংযুক্ত করা এই রেলপথে রয়েছে ২০টি স্টেশন। এর অধিকাংশই নদীর ওপরের অংশে অবস্থিত। পুরো যাত্রাপথ পাড়ি দিতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় লাগে।

এ কারণেই শ্বেবেবান ভুপারটালের কাছে শুধু একটি গণপরিবহনব্যবস্থা নয়, শহরের পরিচয়েরও অংশ। ১২৫ বছর ধরে এটি শহরের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আজকের দিনে ঝুলন্ত ট্রেনে ওঠা হয়তো অনেকের কাছে পর্যটনের আকর্ষণ। কিন্তু ১৯০১ সালে এই প্রযুক্তির সামনে দাঁড়ানো মানুষের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল, সেটি কল্পনা করলেই বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা যায়।
যে সময়ে আধুনিক নগর পরিবহনব্যবস্থা আজকের মতো উন্নত হয়নি, তখন একটি ট্রেনকে ইস্পাতের কাঠামোর সঙ্গে ঝুলিয়ে নদী ও শহরের ওপর দিয়ে চালানোর চিন্তা ছিল নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী প্রকৌশলগত উদ্যোগ।
তখনকার মানুষের প্রয়োজনই নতুন এই পরিবহনব্যবস্থার পথ তৈরি করেছিল। শহরের সীমিত জায়গাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে বেশি মানুষকে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া যায়, সেই প্রশ্নের একটি অভিনব উত্তর হয়ে উঠেছিল শ্বেবেবান।
আজ ১২৫ বছর পরও সেই ধারণা ভুপারটালের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
ট্রেনের জানালার পাশে বসে বারবার মনে হচ্ছিল, মানুষের প্রয়োজন থেকেই অনেক বড় আবিষ্কারের জন্ম হয়। একসময় জায়গার সংকট ছিল, শহরের যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন থেকেই তৈরি হয়েছিল এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা, যা এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে আজও সচল।
আমার কাছে এই যাত্রার বিশেষত্ব এখানেই।
এক শতাব্দীরও বেশি আগে যে পথে মানুষ নতুন এক প্রযুক্তির সম্ভাবনা দেখতে যাত্রা শুরু করেছিল, ১২৫ বছর পর সেই একই পথে আমিও কয়েক মুহূর্তের জন্য যাত্রী হলাম। জানালার বাইরে বদলে যাওয়া শহর, নিচে চলমান মানুষের জীবন আর মাথার ওপর দিয়ে ছুটে চলা ঐতিহাসিক ট্রেন যেন একই ফ্রেমে অতীত ও বর্তমানকে মিলিয়ে দিচ্ছিল।
ভুপারটালের আকাশে ঝুলে থাকা এই ট্রেন তাই আমার কাছে কেবল একটি গণপরিবহন নয়। এটি একটি শহরের ইতিহাস, প্রকৌশলীদের উদ্ভাবনী চিন্তার স্মারক এবং ১২৫ বছর ধরে চলতে থাকা জীবন্ত এক গল্প।
সেই গল্পের দীর্ঘ পথচলার একেবারে ছোট্ট একটি অংশের যাত্রী হয়ে ফিরলাম আমিও।
লেখক: মো. ইকরাম হোসেন, শিক্ষার্থী, জার্মানি




























