বাজেট ঘাটতি সামলাতে ওয়াশিংটন ডিসিতে সাত ধরনের কর বাড়ানোর প্রস্তাব
- প্রকাশঃ ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৪
- / 12
ওয়াশিংটন, ১৯ অক্টোবর (প্রজন্ম কথা) – বড় ধরনের বাজেট ঘাটতির আশঙ্কার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির সিটি কাউন্সিল কর বাড়ানোর সাতটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ওপর নতুন কর, ধনীদের বিনিয়োগ থেকে আয় ও সম্পত্তির ওপর অতিরিক্ত কর এবং আয়কর, বিক্রয়কর ও ভূমি করের কাঠামোয় পরিবর্তন। এসব প্রস্তাবের লক্ষ্য সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতি সামাল দেওয়া হলেও কর বাড়ালে ব্যবসা ও উচ্চ আয়ের বাসিন্দারা অন্য এলাকায় চলে যেতে পারেন বলে উদ্বেগ রয়েছে।
আগামী বসন্তে নতুন মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার সময় নগর কর্তৃপক্ষকে ৬৬ কোটি থেকে ৮৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বাজেট ঘাটতি মোকাবিলা করতে হতে পারে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি কমানোর কারণে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি কমেছে, শহরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে এবং বাণিজ্যিক ভবনভিত্তিক আবাসন ও অফিসের বাজারও দুর্বল রয়েছে। একসময় বাণিজ্যিক সম্পত্তি থেকে পাওয়া কর ছিল নগর সরকারের রাজস্বের নির্ভরযোগ্য উৎস।
শুক্রবার ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা শুনানিতে কর বিশেষজ্ঞ, সমর্থক ও সমালোচকেরা সাতটি প্রস্তাব নিয়ে মত দেন। কাউন্সিল সদস্য ম্যাথিউ ফ্রুমিন বলেন, শিক্ষা ও মানবসেবার খাতে সম্ভাব্য ব্যয় সংকোচনের চাপের মধ্যে নগর কর্তৃপক্ষ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বর্তমান সেবাগুলো বজায় রাখতেও বাড়তি রাজস্ব প্রয়োজন হতে পারে।
তবে কাউন্সিল সদস্য ক্রিস্টিনা হেন্ডারসন সতর্ক করেন, কর বাড়ানোর সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটন ডিসির আঞ্চলিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বিদায়ী মেয়র মুরিয়েল বাউজারও নতুন কর আরোপের বিরোধিতা করে আসছেন।
নগরের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা গ্লেন লি জানিয়েছেন, শরতেই এক বা একাধিক প্রস্তাব অনুমোদিত হলেও আগামী বসন্তের বাজেট প্রণয়নের আগে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় নাও পাওয়া যেতে পারে।
১. ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ওপর নতুন কর
প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যবসার মুনাফার পরিবর্তে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ওপর কর আরোপ করা হবে। এতে বর্তমানে করের বাইরে থাকা কিছু আইনজীবী প্রতিষ্ঠান, লবিং প্রতিষ্ঠান ও অলাভজনক সংস্থা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কেন্দ্রীয় আইনে ওয়াশিংটন ডিসিকে নগরের বাইরে বসবাসকারী ব্যবসার মালিকদের মুনাফার ওপর কর আরোপে সীমাবদ্ধতা থাকায় বিকল্প হিসেবে এ ব্যবস্থা বিবেচনা করা হচ্ছে।
নগরের পরবর্তী মেয়র হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা কাউন্সিল সদস্য জেনিস লুইস জর্জ এই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, করের আওতার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে করব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করলে সর্বজনীন শিশুযত্ন কর্মসূচির মতো উদ্যোগে অর্থায়ন করা সম্ভব হতে পারে। ছোট ব্যবসার ওপর চাপ কমাতে ২ লাখ ডলারের ছাড় এবং আগে থেকেই কর দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর-ক্রেডিটের প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।
ইনস্টিটিউট অন ট্যাক্সেশন অ্যান্ড ইকোনমিক পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নিক জনসনের মতে, এ কর বড় ও সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে করের আওতায় আনতে সহায়তা করতে পারে। তাঁর সহলেখকসহ ডিসি ফিসকাল পলিসি ইনস্টিটিউটের তৈরি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২ শতাংশ হারে এ কর আরোপ করা হলে বছরে ৫০ কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব আসতে পারে।
তবে ব্যবসায়ী ও নাগরিক সংগঠন ফেডারেল সিটি কাউন্সিলের সভাপতি এবং সাবেক মেয়র অ্যান্থনি উইলিয়ামস নতুন ব্যবসায়িক করের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, এতে নগরের বাণিজ্যিক অফিস অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়াশিংটন ডিসিতে থাকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারে। ডিসি পলিসি সেন্টারের পরিচালক ইয়েসিম সায়িনও বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেতনভিত্তিক পারিবারিক ছুটির কর বাড়ানো হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কর দিচ্ছে না, এমন যুক্তি এখন আগের মতো জোরালো নয়।
২. সম্পদ থেকে আয়ের ওপর অতিরিক্ত কর
বিদায়ী কাউন্সিল সদস্য ব্রায়ান নাদেউর প্রস্তাবে শেয়ার ও বন্ড বিক্রির মুনাফা, শেয়ার থেকে পাওয়া লভ্যাংশ এবং ভাড়া থেকে আয়ের মতো সম্পদভিত্তিক আয়ের ওপর ৩ শতাংশ অতিরিক্ত কর আরোপের কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবটির পক্ষে নাদেউ বলেন, এতে ধনী বাসিন্দাদের নিষ্ক্রিয় আয় থেকে তুলনামূলক বেশি কর আদায় করা সম্ভব হবে। তাঁর কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ কর থেকে বছরে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২০ কোটি ডলার পর্যন্ত রাজস্ব আসতে পারে।
ডিসি ফিসকাল পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক এরিকা উইলিয়ামস বলেন, এ করের আওতায় পড়া অধিকাংশ মানুষের বার্ষিক আয় ১০ লাখ ডলারের বেশি হবে। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মেডিকেইড ও খাদ্যসহায়তার মতো কর্মসূচিতে কাটছাঁটের সময় এ রাজস্ব নগরের জনসেবায় বিনিয়োগে সহায়তা করতে পারে।
তবে ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা ক্যাথরিন লফহেডের আশঙ্কা, অতিরিক্ত করের কারণে কিছু উচ্চ আয়ের বাসিন্দা ওয়াশিংটন ডিসির বদলে মেরিল্যান্ড বা ভার্জিনিয়ায় বসবাসের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। শেয়ারবাজারের ওঠানামার ওপর এ করের আয় নির্ভর করায় রাজস্বও অনিশ্চিত হতে পারে। প্রস্তাবটির সমর্থকেরা বলেছেন, এ ঝুঁকি সামলাতে অর্থ এককালীন ব্যয়ে ব্যবহার করা বা সংরক্ষিত তহবিলে রাখা যেতে পারে।
৩. বহিরাগতদের বিলাসবহুল দ্বিতীয় বাড়িতে কর
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির প্রচারিত ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওয়াশিংটন ডিসিতেও বহিরাগত ধনীদের বিলাসবহুল দ্বিতীয় বাড়ির ওপর বাড়তি কর আরোপের প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২৫ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের দ্বিতীয় বাড়ির করহার হবে প্রধান আবাসিক বাড়ির তুলনায় দ্বিগুণ।
ফেয়ার বাজেট কোয়ালিশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ক্যাথারিন ল্যান্ডফিল্ড সম্পদভিত্তিক কর বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে তাঁর মতে, দ্বিতীয় বাড়ির ওপর কর একা নগরের কাঠামোগত বাজেট ঘাটতি মেটাতে পারবে না। ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের লফহেড বলেছেন, এতে করের বোঝা তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক সম্পত্তির মালিকের ওপর বেশি পড়তে পারে, যদিও তাঁরা নগরের স্কুল, সড়ক ও অন্যান্য সেবা তুলনামূলক কম ব্যবহার করেন।
৪. সম্পত্তি কর বাড়ানো
নগরের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দীর্ঘদিন ধরে সম্পত্তি কর বাড়ানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তবে এবার সব ধরনের সম্পত্তির ওপর কর এক সেন্ট অথবা ১০ সেন্ট বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। খালি বা পরিত্যক্ত সম্পত্তি এ প্রস্তাবের বাইরে রাখার কথা বলা হয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে আবাসিক সম্পত্তির করহার অঞ্চলটির মধ্যে সবচেয়ে কম হলেও বাণিজ্যিক সম্পত্তির করহার ইতিমধ্যেই তুলনামূলক বেশি। শুনানিতে এ কর বাড়ানোর পক্ষে খুব বেশি সমর্থন পাওয়া যায়নি।
ওয়াশিংটন ন্যাশনালসের কর্মকর্তা গ্রেগরি ম্যাকার্থি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নগরে কর দিয়ে আসা বাসিন্দাদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করলে তাঁদের ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। সমালোচকদের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক সম্পত্তির কর বাড়লে বাড়ির মালিকেরা সেই খরচ ভাড়াটিয়াদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন।
৫. উচ্চ আয়ের বাসিন্দাদের আয়কর বৃদ্ধি
নতুন প্রস্তাবে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি আয় করা পরিবারগুলোর প্রান্তিক আয়কর হার ০.৫ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। আয় যত বাড়বে, উচ্চতর আয়সীমার ক্ষেত্রে করহারও ধাপে ধাপে বাড়তে পারে।
২০২১ সালে ওয়াশিংটন ডিসির কাউন্সিল ধনীদের আয়কর বাড়িয়েছিল। সেই রাজস্ব আবাসন ভাউচার ও শিশুযত্নকর্মীদের বেতন সহায়তার মতো সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যয় করার পরিকল্পনা ছিল।
ফেয়ার বাজেট কোয়ালিশনের ল্যান্ডফিল্ড বলেছেন, তাঁর সংগঠন ধনীদের আয়কর বাড়ানোর পক্ষে থাকলেও বর্তমান প্রস্তাব যথেষ্ট নয়। ৩০ লাখ ও এক কোটি ডলারের বেশি আয়ের জন্য আলাদা উচ্চতর করহার চালুর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তবে নগরের প্রধান অর্থ কর্মকর্তার কার্যালয় সতর্ক করেছে, উচ্চ আয়ের কিছু বাসিন্দা চলে গেলেও রাজস্বে বড় প্রভাব পড়তে পারে। নগরের প্রায় ১২ হাজার সর্বোচ্চ আয়ের করদাতা মোট করদাতার ৩ শতাংশ হলেও ব্যক্তিগত আয়কর রাজস্বের ৪২ শতাংশ দেন, যার পরিমাণ প্রায় ১৪০ কোটি ডলার।
৬. বিক্রয়কর বাড়ানোর প্রস্তাব
ওয়াশিংটন ডিসিতে বিক্রয়কর ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত আগে নেওয়া হয়েছিল। তবে আইনপ্রণেতারা তা স্থগিত করে আগামী অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে দেন। এখন নির্ধারিত সময় থেকে বাড়তি কর কার্যকর করা হবে কি না, তা আবার পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এ প্রস্তাবের পক্ষে শুনানিতে তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি। ডিসি ফিসকাল পলিসি ইনস্টিটিউটের এরিকা উইলিয়ামস বলেন, বিক্রয়কর বাড়ালে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তুলনামূলক বেশি চাপে পড়বে। তাই এ প্রস্তাব বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
৭. ভূমি করের কাঠামোয় পরিবর্তন
ব্রায়ান নাদেউর আরেকটি প্রস্তাবে জমির মূল্য এবং জমির ওপর নির্মিত ভবন বা অন্যান্য উন্নয়নের মূল্য আলাদাভাবে হিসাব করে কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এতে জমির ওপর করের হার বেশি এবং ভবন বা উন্নয়নের ওপর করের হার কম রাখা যেতে পারে।
প্রস্তাবের সমর্থকদের মতে, এতে খালি জমি উন্নয়ন কিংবা বিদ্যমান সম্পত্তিতে নতুন নির্মাণে উৎসাহ তৈরি হবে। নেব্রাস্কা-লিংকন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জন অ্যান্ডারসন বলেছেন, এ ধরনের করব্যবস্থা উচ্চ ঘনত্বের উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে পারে, কারণ ভবন উন্নত করার জন্য তুলনামূলক কম কর দিতে হবে।
তবে জমির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ এবং নতুন পদ্ধতি কার্যকর করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ন্যাশনাল ট্যাক্সপেয়ার্স ইউনিয়ন ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা জো বিশপ-হেনচম্যান বলেছেন, জমির মূল্য নির্ধারণ শুনতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে তা জটিল। নগরের প্রধান অর্থ কর্মকর্তার কার্যালয়ও জানিয়েছে, বর্তমানে এ ধরনের কর চালুর প্রয়োজনীয় কাঠামো তাদের নেই। পুরো নগরের প্রতিটি জমির মূল্য নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।
কর বাড়ানোর প্রস্তাবগুলো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে নগর কাউন্সিলকে সম্ভাব্য রাজস্ব, ব্যবসা ও বাসিন্দাদের ওপর প্রভাব এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা বিবেচনা করতে হবে। বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় কর বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় কমানোর পথও খুঁজতে হবে বলে শুনানিতে একাধিক কাউন্সিল সদস্য জানিয়েছেন।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

























