ঢাকা ১১:০২ , Sun, ০৫ Jul ২০২৬
বিশ্বসমাচার
যুক্তরাজ্যে

বন্ধুত্ব নাকি স্বার্থের সম্পর্ক? নাইজেল ফারাজকে ঘিরে যুক্তরাজ্যে নতুন বিতর্ক

প্রজন্ম কথা ডেস্ক
  • প্রকাশঃ ০৫ জুলাই ২০২৬, ১৯:৪৮
  • / 6
নাইজেল ফারাজ ও জর্জ কট্রেলকে ঘিরে দ্য সানডে টাইমস-এর অনুসন্ধান যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী রাজনৈতিক দল রিফর্ম ইউকে-এর নেতা নাইজেল ফারাজকে ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য সানডে টাইমস-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। পত্রিকাটির দাবি, দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও যুক্তরাষ্ট্রে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্রিটিশ অভিজাত জর্জ সুইনফেন কট্রেলের কাছ থেকে ফারাজ এমন একাধিক আর্থিক ও অ-আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন, যার বেশিরভাগই প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, কর্মী নিয়োগ, আবাসন, ভ্রমণ এবং নির্বাচনী প্রস্তুতিতে কট্রেলের দেওয়া সহায়তা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যদের জন্য নির্ধারিত স্বার্থ-ঘোষণার (Register of Interests) নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে ফারাজ ও তাঁর দল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, কোনো সংসদীয় নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়নি।

দ্য সানডে টাইমসের অনুসন্ধানী বিভাগ ইনসাইট বলছে, ফারাজের সঙ্গে কট্রেলের সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও কট্রেলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৬ জুন সন্ধ্যায় কালো কাঁচযুক্ত একটি রেঞ্জ রোভার গাড়ি বাকিংহাম প্যালেসের কাছের একটি নিরিবিলি সড়কে এসে থামে। গাড়ির চালক সেটি এমনভাবে পার্ক করেন, যাতে পেছনের আসনের যাত্রীকে খুব কম দূরত্ব হাঁটতে হয়।

প্রথমে গাড়ি থেকে নামেন রয়্যাল মেরিনস কমান্ডোর সাবেক এক সদস্য, যিনি সাধারণ নির্বাচনের পর নাইজেল ফারাজের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি পেছনের দরজা খুলে দেন। তবে গাড়ি থেকে নামেননি ফারাজ। সে সময় তিনি উত্তর ইংল্যান্ডে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন।

গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন জর্জ সুইনফেন কট্রেল—যিনি ‘পশ জর্জ’ নামেও পরিচিত। দ্য সানডে টাইমসের দাবি, তাঁর কাছেই ছিল বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ এবং তিনিই দীর্ঘদিন ধরে ফারাজের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে আসছেন।

কে এই জর্জ কট্রেল?

৩২ বছর বয়সী জর্জ সুইনফেন কট্রেল ব্রিটিশ অভিজাত পরিবারের সন্তান। একসময় তিনি ইউকিপ (UKIP)-এ নাইজেল ফারাজের তহবিল সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ পাচার-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি শেষ পর্যন্ত ইলেকট্রনিক জালিয়াতির (Wire Fraud) একটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন এবং কারাদণ্ড ভোগ করেন।

এরপর তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন জুয়া-ভিত্তিক ব্যবসায় যুক্ত হন। বর্তমানে তাঁর নাম একাধিক অফশোর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্য সানডে টাইমসের ভাষ্য, যদিও রিফর্ম ইউকে-তে কট্রেলের কোনো আনুষ্ঠানিক পদ নেই, তবু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ফারাজের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন। ওয়েস্টমিনস্টার থেকে শুরু করে নির্বাচনী সফর—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁকে ফারাজের সঙ্গে দেখা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কট্রেল ব্যক্তিগতভাবে ফারাজকে “ড্যাডি” বলে সম্বোধন করেন। তাঁদের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে, কট্রেলের এক বাড়িতে সংরক্ষিত রয়েছে এমপি হিসেবে ফারাজের প্রথম সংসদীয় ভাষণের স্বাক্ষরিত একটি কপি। সেই কপিতে ফারাজ লিখেছিলেন, “সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।” দ্য সানডে টাইমসের দাবি, এই সম্পর্কের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব নয়, দীর্ঘদিনের আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তার ইতিহাসও রয়েছে।

অনুসন্ধানে কী দাবি করা হয়েছে?

পত্রিকাটির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগের এক বছরে কট্রেল ফারাজকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়েছেন, যার মধ্যে ছিল— ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার খরচ বহন, কর্মী নিয়োগ ও তাঁদের বেতন প্রদান, ব্যাক-অফিস পরিচালনায় সহায়তা, ভ্রমণ ও আবাসনের ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রচারণার বিভিন্ন সাংগঠনিক সহযোগিতা।

দ্য সানডে টাইমসের দাবি, এসব সুবিধার অধিকাংশই এমপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর ফারাজ তাঁর স্বার্থের নিবন্ধনে (Register of Interests) উল্লেখ করেননি। তবে ফারাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব সুবিধা প্রকাশ করার কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা ছিল না।

আচরণবিধি কী বলে?

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আচরণবিধি অনুযায়ী, কোনো এমপি এমন আর্থিক বা অ-আর্থিক সুবিধা পেলে, যা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করতে পারে বলে যুক্তিসঙ্গতভাবে মনে করা যায়, সেটি স্বার্থের নিবন্ধনে উল্লেখ করতে হয়। নির্বাচনের আগের এক বছরে পাওয়া উপহার, আতিথেয়তা বা অন্যান্য সুবিধাও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঘোষণা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

দ্য সানডে টাইমসের দাবি, কট্রেলের কাছ থেকে ফারাজ কেবল একটি সুবিধার তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। সেটি ছিল বেলজিয়ামে একটি সম্মেলনে অংশ নিতে ভ্রমণ, নিরাপত্তা ও আবাসন বাবদ প্রায় ৯ হাজার ২৫৪ পাউন্ডের ব্যয়। পত্রিকাটির মতে, এর বাইরে আরও যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে, ফারাজ ইতোমধ্যেই পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনারের পৃথক এক তদন্তের মুখোমুখি রয়েছেন। সেখানে অভিযোগ, ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের ধনকুবের ক্রিস্টোফার হারবোর্নের কাছ থেকে পাওয়া প্রায় ৫০ লাখ পাউন্ড মূল্যের একটি অনুদান যথাযথভাবে ঘোষণা করা হয়নি। যদিও ফারাজ এই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, ওই অনুদান প্রকাশ করার কোনো বাধ্যবাধকতা তাঁর ছিল না।

জর্জ সুইনফেন কট্রেলের জীবন শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ অভিজাত পরিবারের সদস্য হিসেবে। কিন্তু অল্প বয়সেই তাঁর জীবনের গতিপথ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। বোর্ডিং স্কুল থেকে বহিষ্কার, জুয়ায় আসক্তি, আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের জগতে প্রবেশ এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর অতীত বহু বছর ধরেই বিতর্কের বিষয়।

তবুও এই মানুষটিই পরবর্তীকালে নাইজেল ফারাজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন হয়ে ওঠেন। ফারাজের রাজনৈতিক সফর, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৌশল এবং নির্বাচনী প্রচারণার নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কট্রেলের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়তে থাকে।

১৯৯৩ সালে ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া জর্জ কট্রেল একটি অভিজাত ব্রিটিশ পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর মা ফিওনা কট্রেল ব্রিটিশ অভিজাত বংশের সদস্য এবং বাবা মার্ক কট্রেলও উচ্চবিত্ত সামাজিক পরিমণ্ডলে পরিচিত ছিলেন। শৈশবের একটি বড় অংশ তিনি কাটান ক্যারিবীয় দ্বীপ মাস্টিকে। পরে তাঁকে ইংল্যান্ডের মালভার্ন কলেজে পাঠানো হয়। তবে জুয়ায় আসক্তির কারণে তিনি পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ নিয়ে বাজি ধরতে যাওয়ার ঘটনায় ২০১০ সালে তাঁকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে তিনি আর্থিক লেনদেন, উচ্চবিত্ত গ্রাহকদের জন্য ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং পরে ক্রিপ্টোকারেন্সি–ভিত্তিক কার্যক্রমে যুক্ত হন।

কট্রেলের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় শুরু হয় ২০১৬ সালে।সেই বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী সমাবেশে নাইজেল ফারাজের সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। কিন্তু ওহাইও থেকে ফেরার পথে শিকাগো বিমানবন্দরে মার্কিন ফেডারেল এজেন্টরা তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, কয়েক বছর আগে তিনি ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে অর্থ পাচারের একটি পরিকল্পনায় অংশ নিয়েছিলেন। তদন্তে দেখা যায়, যাদের তিনি অর্থ পাচারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তারা আসলে ছদ্মবেশী ফেডারেল এজেন্ট ছিলেন। প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হলেও পরে তিনি ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতারণা (Wire Fraud)–সংক্রান্ত একটি অভিযোগ স্বীকার করেন। একটি সমঝোতার ভিত্তিতে দীর্ঘ কারাদণ্ডের পরিবর্তে তিনি প্রায় আট মাস কারাভোগ করেন।

কারাগার থেকে ফিরে নতুন অধ্যায়

২০১৭ সালের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার পর কট্রেল কিছু সময় নিজেকে জনসমক্ষে আড়ালে রাখলেও পরে আবার ব্যবসা ও রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে শুরু করেন। প্রথমদিকে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল তা ছিল “তারুণ্যের ভুল” এবং ভবিষ্যতে তিনি ভিন্নভাবে জীবন গড়তে চান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবারও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরিতে মনোযোগ দেন।

একই সময়ে নাইজেল ফারাজও তাঁকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেননি। বরং রাজনৈতিক অঙ্গনে ফারাজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের তালিকায় কট্রেলের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে থাকে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউকিপ (UKIP) যুগ থেকেই কট্রেল ধীরে ধীরে ফারাজের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। দলীয় তহবিল সংগ্রহ, বড় দাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক সফর—এসব ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ফারাজের ঘনিষ্ঠদের ভাষ্যমতে, কট্রেল শুধু প্রশাসনিক সহকারী ছিলেন না; তিনি অনেক সময় ব্যক্তিগত উপদেষ্টা, সফরসঙ্গী এবং সংকটকালীন সমন্বয়কারীর ভূমিকাও পালন করতেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ফারাজকে “ড্যাডি” বলেও সম্বোধন করতেন।

২০২৩ সালে নাইজেল ফারাজ নতুনভাবে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা শুরু করলে কট্রেলও আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেন। তাঁর অর্থায়নে কয়েকজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের কাজ ছিল—ফারাজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুনভাবে সাজানো; টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও এক্স (সাবেক টুইটার)-এ প্রচারণা বৃদ্ধি; অভিবাসন, মানবাধিকার আইন, সাংস্কৃতিক রাজনীতি ও জাতীয় পরিচয় ইস্যুতে নিয়মিত ভিডিও ও কনটেন্ট তৈরি; তরুণ ভোটারদের কাছে ফারাজের জনপ্রিয়তা বাড়ানো। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই ডিজিটাল টিমের সদস্যদের বেতনও দীর্ঘ সময় কট্রেলের ব্যক্তিগত অর্থ থেকেই পরিশোধ করা হয়েছিল।

এই সময় থেকেই ফারাজের ডিজিটাল উপস্থিতিতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। আগের তুলনায় অনেক বেশি পেশাদার ভিডিও, সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক বক্তব্য, দ্রুত সম্পাদিত ক্লিপ এবং তরুণদের উপযোগী কনটেন্ট প্রকাশ হতে থাকে। অভিবাসন, ছোট নৌকায় অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ, “নেট জিরো” নীতি, সাংস্কৃতিক বিতর্ক এবং আইনশৃঙ্খলা—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি ভিডিওগুলো লক্ষাধিক থেকে মিলিয়ন ভিউ পেতে শুরু করে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে ফারাজ অন্য অনেক ব্রিটিশ রাজনৈতিক নেতার তুলনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন।

২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন ঘোষণার পর কট্রেলের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণার পুরো সময় তিনি প্রায় নিয়মিতভাবে ফারাজের সঙ্গে ভ্রমণ করেছেন। প্রচারসভা, নিরাপত্তা সমন্বয়, সফর ব্যবস্থাপনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট এবং প্রচারণার নেপথ্যের বিভিন্ন কাজে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।

ফারাজের ওপর মিল্কশেক নিক্ষেপের বহুল আলোচিত ঘটনাতেও কট্রেল ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফারাজের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের পুরো প্রক্রিয়ায় কট্রেল শুধু একজন বন্ধু ছিলেন না; বরং অর্থায়ন, কৌশল, যোগাযোগ ও সাংগঠনিক সহায়তার মাধ্যমে তিনি নেপথ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। তবে নাইজেল ফারাজ ও রিফর্ম ইউকে এই অভিযোগগুলোর অনেকগুলোই অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, কট্রেলের দেওয়া সহায়তার বড় অংশই ছিল ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের ভিত্তিতে এবং সেগুলো সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী ঘোষণা করার বাধ্যবাধকতা ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রে সাজা ভোগের পর জর্জ কট্রেল আবারও আলোচনায় আসেন, তবে এবার রাজনীতির কারণে নয়; বরং ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন জুয়া ব্যবসার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। দ্য সানডে টাইমস–এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কট্রেল দীর্ঘদিন ধরে Tether.bet নামের একটি অফশোর অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্যবসার কাঠামো, অর্থ লেনদেনের পদ্ধতি এবং যুক্তরাজ্যে সম্ভাব্য কার্যক্রম নিয়ে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে।

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কট্রেল ইউরোপের ছোট দেশ মন্টিনিগ্রোতে চলে যান। সেখানে তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন বেটিং খাতে নতুন ব্যবসায় যুক্ত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে বলা হয়েছে, তিনি Tether.bet–এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। এটি এমন একটি অনলাইন বুকমেকার ও ক্যাসিনো প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ব্যবহারকারীরা খেলাধুলা, রাজনীতি এবং বিভিন্ন ঘটনার ওপর বড় অঙ্কের বাজি ধরতে পারতেন। প্ল্যাটফর্মটির নামকরণ করা হয় Tether নামের জনপ্রিয় স্টেবলকয়েনকে কেন্দ্র করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, Tether.bet কোনো একক কোম্পানি হিসেবে পরিচালিত হতো না। বরং এটি ছিল বিভিন্ন অফশোর প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি জটিল ব্যবসায়িক কাঠামো। এতে—মন্টিনিগ্রোতে অফিস ও ব্যাংকিং কার্যক্রম, কুরাকাওয়ের (Curaçao) জুয়া লাইসেন্স, সাইপ্রাসভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন অফশোর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মালিকানার কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ধরনের কাঠামোর ফলে প্রকৃত মালিকানা সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়।

Tether.bet নিজেদের এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপন করত, যেখানে প্রচলিত বুকমেকারদের তুলনায় অনেক বড় অঙ্কের বাজি ধরা সম্ভব। ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ জমা ও উত্তোলনের সুবিধাও ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্বোধনের সময় প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছিল যে, তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের একটি বাজি গ্রহণ করেছে। এছাড়া উচ্চ সম্পদশালী জুয়াড়ি, বিনিয়োগকারী এবং কিছু পেশাদার বেটিং সিন্ডিকেটও এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি ছিল যুক্তরাজ্যে প্ল্যাটফর্মটির সম্ভাব্য কার্যক্রম। দ্য সানডে টাইমস–এর দাবি, Tether.bet–এর যুক্তরাজ্যে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জুয়া লাইসেন্স ছিল না। তবুও কিছু ব্রিটিশ ব্যবহারকারী প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করতে পেরেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও দাবি করা হয়েছে, কয়েকজন মধ্যস্থতাকারী যুক্তরাজ্যের গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করতেন।

পরে সেই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া হতো। বাজিতে জয়ী হলে একই ধরনের প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরত দেওয়া হতো।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। এর একটি ছিল Global G Corp Ltd এবং অন্যটি Fispay Ltd। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কিছু অর্থ লেনদেন সম্পন্ন হতো। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একটি প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, কোম্পানিটি বাস্তবে কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেনি।

জুয়া আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি যুক্তরাজ্যে লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান দেশটির গ্রাহকদের কাছে জুয়া সেবা দিয়ে থাকে, তাহলে সেটি আইনি প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে অবৈধ জুয়া থেকে অর্জিত অর্থের লেনদেন অর্থ পাচারবিরোধী আইনেও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এসব বিষয়ে কট্রেলের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি।

কট্রেল এসব অভিযোগের অনেকটাই প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী— তিনি Tether.bet–এর জন্য যুক্তরাজ্যে গ্রাহক সংগ্রহ করেননি; অবৈধ জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনায় জড়িত ছিলেন না; এবং তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনেক দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আইনজীবীরা আরও বলেন, বিভিন্ন মামলায় যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোর বড় অংশই প্রমাণিত হয়নি।

অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, কট্রেলের এই ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চলাকালেই নাইজেল ফারাজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, ফারাজ একাধিকবার মন্টিনিগ্রো সফরে কট্রেলের অতিথি ছিলেন এবং সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

একই সময়ে ফারাজ যুক্তরাজ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে শুরু করেন। তিনি যুক্তরাজ্যকে বৈশ্বিক ক্রিপ্টো হাব হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে বক্তব্য দেন এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা করেন। তবে প্রতিবেদনে কোথাও দাবি করা হয়নি যে, ফারাজ Tether.bet–এর ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বরং অনুসন্ধানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কট্রেলের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং ফারাজের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে কোনো সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত (conflict of interest) ছিল কি না। এ বিষয়ে ফারাজ ও কট্রেল—উভয় পক্ষই কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা আদান-প্রদানের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

জর্জ কট্রেলকে ঘিরে দ্য সানডে টাইমস–এর অনুসন্ধানের শেষ অংশে উঠে এসেছে বড় অঙ্কের রাজনৈতিক অনুদান, বিলাসবহুল সম্পত্তি হস্তান্তর, যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমা (Presidential Pardon) পাওয়ার প্রচেষ্টা এবং পুরো ঘটনার বিষয়ে রিফর্ম ইউকে–এর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া। প্রতিবেদনটি দাবি করছে, এসব বিষয় মিলিয়ে নাইজেল ফারাজ ও তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জর্জ কট্রেলের সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি রাজনৈতিক, আর্থিক ও ব্যবসায়িক বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত ছিল। তবে ফারাজ, কট্রেল এবং রিফর্ম ইউকে এসব অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রত্যাখ্যান করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে জর্জ কট্রেলের মা ফিওনা কট্রেল রিফর্ম ইউকেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড অনুদান দেন। নির্বাচনী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই অনুদান তাঁকে দলটির অন্যতম বড় দাতায় পরিণত করে। তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে, ফিওনা নিজেকে একজন অবসরপ্রাপ্ত স্টাইলিস্ট হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে আদালতের নথিতে তাঁর পারিবারিক সম্পদের মূল্য প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ড উল্লেখ রয়েছে।

তবে এই অনুদানের উৎস বা অর্থায়নের প্রকৃতি নিয়ে অনুসন্ধানে প্রশ্ন তোলা হলেও কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। অনুসন্ধানের আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল রিফর্ম ইউকের কোষাধ্যক্ষ ও ব্যবসায়ী নিক ক্যান্ডি–র একটি বিলাসবহুল সম্পত্তি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চেলসিতে অবস্থিত প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি বাড়ির মালিকানা পরে জর্জ কট্রেলের নামে চলে যায়। ভূমি নিবন্ধন সংক্রান্ত নথিতে এই হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অর্থমূল্য শূন্য হিসেবে উল্লেখ ছিল। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও নিক ক্যান্ডি বলেন, এটি কোনো উপহার ছিল না।

তাঁর দাবি, গার্নসিভিত্তিক একটি অফশোর কোম্পানির শেয়ার লেনদেন এবং পূর্ববর্তী আর্থিক সমঝোতার অংশ হিসেবেই সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তন হয়েছিল। তবে তিনি কত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।

ট্রাম্পের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্জ কট্রেল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর পুরোনো ফৌজদারি দণ্ড মওকুফের জন্য প্রেসিডেন্টের ক্ষমা (Presidential Pardon) পাওয়ার চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বিরুদ্ধে ওয়্যার ফ্রড মামলার দণ্ড বহাল রয়েছে। এই প্রসঙ্গে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে, নাইজেল ফারাজের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গেও ফারাজের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে কোথাও বলা হয়নি যে ফারাজ কট্রেলের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়ে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন।

তদন্তে আরও বলা হয়েছে, কট্রেল সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন। প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক প্রচারণা, জনমত জরিপ, আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং কৌশলগত যোগাযোগ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার দাবি করছে। একই সময়ে তিনি অর্থ পাচারবিরোধী বিষয় নিয়ে একটি বইও প্রকাশ করেছেন। কট্রেলের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে এই বই লিখেছেন।

পুরো অনুসন্ধান প্রকাশের পর রিফর্ম ইউকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়। দলটির বক্তব্য, দ্য সানডে টাইমস–এর প্রতিবেদনটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভিত্তিহীন।

তাদের দাবি—প্রতিবেদনের বড় অংশ এমন সময়কার ঘটনা নিয়ে, যখন নাইজেল ফারাজ সংসদ সদস্য ছিলেন না। কোনো সংসদীয় নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি। ব্যক্তিগত বন্ধুত্বকে রাজনৈতিক অনুদান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পুরো অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য নতুন একটি পডকাস্ট প্রচার করা।ফারাজ নিজেও অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তিনি সংসদীয় নিয়ম ভঙ্গ করেননি এবং যেসব সুবিধা প্রকাশ করা প্রয়োজন ছিল, সেগুলো যথাযথভাবেই ঘোষণা করেছেন।

এই দীর্ঘ অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—একজন প্রভাবশালী রাজনীতিকের ব্যক্তিগত বন্ধু যদি দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপত্তা, আবাসন, কর্মী, ভ্রমণ কিংবা অন্যান্য সহায়তা প্রদান করেন, তাহলে সেগুলো কোন পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবে বিবেচিত হবে এবং কোন পর্যায়ে তা জনস্বার্থে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হয়ে উঠবে? সংসদীয় আচরণবিধি, রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই পুরো বিতর্ক আবর্তিত হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত নাইজেল ফারাজ, জর্জ কট্রেল কিংবা রিফর্ম ইউকের বিরুদ্ধে এই অনুসন্ধানের ভিত্তিতে কোনো নতুন ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি। তবে দ্য সানডে টাইমস–এর অনুসন্ধান যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অর্থায়ন, সংসদ সদস্যদের স্বার্থ ঘোষণা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের সীমা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে সংসদীয় স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনারের সম্ভাব্য তদন্ত কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা এই বিতর্কের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করতে পারে।

সূত্র: The Sunday Times–এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রকাশিত বক্তব্যের ভিত্তিতে

❤️
👏
🙂
😞

বন্ধুত্ব নাকি স্বার্থের সম্পর্ক? নাইজেল ফারাজকে ঘিরে যুক্তরাজ্যে নতুন বিতর্ক

প্রকাশঃ ০৫ জুলাই ২০২৬, ১৯:৪৮

যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী রাজনৈতিক দল রিফর্ম ইউকে-এর নেতা নাইজেল ফারাজকে ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য সানডে টাইমস-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। পত্রিকাটির দাবি, দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও যুক্তরাষ্ট্রে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্রিটিশ অভিজাত জর্জ সুইনফেন কট্রেলের কাছ থেকে ফারাজ এমন একাধিক আর্থিক ও অ-আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন, যার বেশিরভাগই প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, কর্মী নিয়োগ, আবাসন, ভ্রমণ এবং নির্বাচনী প্রস্তুতিতে কট্রেলের দেওয়া সহায়তা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যদের জন্য নির্ধারিত স্বার্থ-ঘোষণার (Register of Interests) নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে ফারাজ ও তাঁর দল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, কোনো সংসদীয় নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়নি।

দ্য সানডে টাইমসের অনুসন্ধানী বিভাগ ইনসাইট বলছে, ফারাজের সঙ্গে কট্রেলের সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও কট্রেলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৬ জুন সন্ধ্যায় কালো কাঁচযুক্ত একটি রেঞ্জ রোভার গাড়ি বাকিংহাম প্যালেসের কাছের একটি নিরিবিলি সড়কে এসে থামে। গাড়ির চালক সেটি এমনভাবে পার্ক করেন, যাতে পেছনের আসনের যাত্রীকে খুব কম দূরত্ব হাঁটতে হয়।

প্রথমে গাড়ি থেকে নামেন রয়্যাল মেরিনস কমান্ডোর সাবেক এক সদস্য, যিনি সাধারণ নির্বাচনের পর নাইজেল ফারাজের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি পেছনের দরজা খুলে দেন। তবে গাড়ি থেকে নামেননি ফারাজ। সে সময় তিনি উত্তর ইংল্যান্ডে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন।

গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন জর্জ সুইনফেন কট্রেল—যিনি ‘পশ জর্জ’ নামেও পরিচিত। দ্য সানডে টাইমসের দাবি, তাঁর কাছেই ছিল বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ এবং তিনিই দীর্ঘদিন ধরে ফারাজের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে আসছেন।

কে এই জর্জ কট্রেল?

৩২ বছর বয়সী জর্জ সুইনফেন কট্রেল ব্রিটিশ অভিজাত পরিবারের সন্তান। একসময় তিনি ইউকিপ (UKIP)-এ নাইজেল ফারাজের তহবিল সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ পাচার-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি শেষ পর্যন্ত ইলেকট্রনিক জালিয়াতির (Wire Fraud) একটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন এবং কারাদণ্ড ভোগ করেন।

এরপর তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন জুয়া-ভিত্তিক ব্যবসায় যুক্ত হন। বর্তমানে তাঁর নাম একাধিক অফশোর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্য সানডে টাইমসের ভাষ্য, যদিও রিফর্ম ইউকে-তে কট্রেলের কোনো আনুষ্ঠানিক পদ নেই, তবু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ফারাজের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন। ওয়েস্টমিনস্টার থেকে শুরু করে নির্বাচনী সফর—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁকে ফারাজের সঙ্গে দেখা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কট্রেল ব্যক্তিগতভাবে ফারাজকে “ড্যাডি” বলে সম্বোধন করেন। তাঁদের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে, কট্রেলের এক বাড়িতে সংরক্ষিত রয়েছে এমপি হিসেবে ফারাজের প্রথম সংসদীয় ভাষণের স্বাক্ষরিত একটি কপি। সেই কপিতে ফারাজ লিখেছিলেন, “সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।” দ্য সানডে টাইমসের দাবি, এই সম্পর্কের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব নয়, দীর্ঘদিনের আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তার ইতিহাসও রয়েছে।

অনুসন্ধানে কী দাবি করা হয়েছে?

পত্রিকাটির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগের এক বছরে কট্রেল ফারাজকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়েছেন, যার মধ্যে ছিল— ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার খরচ বহন, কর্মী নিয়োগ ও তাঁদের বেতন প্রদান, ব্যাক-অফিস পরিচালনায় সহায়তা, ভ্রমণ ও আবাসনের ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রচারণার বিভিন্ন সাংগঠনিক সহযোগিতা।

দ্য সানডে টাইমসের দাবি, এসব সুবিধার অধিকাংশই এমপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর ফারাজ তাঁর স্বার্থের নিবন্ধনে (Register of Interests) উল্লেখ করেননি। তবে ফারাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব সুবিধা প্রকাশ করার কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা ছিল না।

আচরণবিধি কী বলে?

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আচরণবিধি অনুযায়ী, কোনো এমপি এমন আর্থিক বা অ-আর্থিক সুবিধা পেলে, যা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করতে পারে বলে যুক্তিসঙ্গতভাবে মনে করা যায়, সেটি স্বার্থের নিবন্ধনে উল্লেখ করতে হয়। নির্বাচনের আগের এক বছরে পাওয়া উপহার, আতিথেয়তা বা অন্যান্য সুবিধাও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঘোষণা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

দ্য সানডে টাইমসের দাবি, কট্রেলের কাছ থেকে ফারাজ কেবল একটি সুবিধার তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। সেটি ছিল বেলজিয়ামে একটি সম্মেলনে অংশ নিতে ভ্রমণ, নিরাপত্তা ও আবাসন বাবদ প্রায় ৯ হাজার ২৫৪ পাউন্ডের ব্যয়। পত্রিকাটির মতে, এর বাইরে আরও যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে, ফারাজ ইতোমধ্যেই পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনারের পৃথক এক তদন্তের মুখোমুখি রয়েছেন। সেখানে অভিযোগ, ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের ধনকুবের ক্রিস্টোফার হারবোর্নের কাছ থেকে পাওয়া প্রায় ৫০ লাখ পাউন্ড মূল্যের একটি অনুদান যথাযথভাবে ঘোষণা করা হয়নি। যদিও ফারাজ এই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, ওই অনুদান প্রকাশ করার কোনো বাধ্যবাধকতা তাঁর ছিল না।

জর্জ সুইনফেন কট্রেলের জীবন শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ অভিজাত পরিবারের সদস্য হিসেবে। কিন্তু অল্প বয়সেই তাঁর জীবনের গতিপথ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। বোর্ডিং স্কুল থেকে বহিষ্কার, জুয়ায় আসক্তি, আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের জগতে প্রবেশ এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর অতীত বহু বছর ধরেই বিতর্কের বিষয়।

তবুও এই মানুষটিই পরবর্তীকালে নাইজেল ফারাজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন হয়ে ওঠেন। ফারাজের রাজনৈতিক সফর, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৌশল এবং নির্বাচনী প্রচারণার নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কট্রেলের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়তে থাকে।

১৯৯৩ সালে ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া জর্জ কট্রেল একটি অভিজাত ব্রিটিশ পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর মা ফিওনা কট্রেল ব্রিটিশ অভিজাত বংশের সদস্য এবং বাবা মার্ক কট্রেলও উচ্চবিত্ত সামাজিক পরিমণ্ডলে পরিচিত ছিলেন। শৈশবের একটি বড় অংশ তিনি কাটান ক্যারিবীয় দ্বীপ মাস্টিকে। পরে তাঁকে ইংল্যান্ডের মালভার্ন কলেজে পাঠানো হয়। তবে জুয়ায় আসক্তির কারণে তিনি পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ নিয়ে বাজি ধরতে যাওয়ার ঘটনায় ২০১০ সালে তাঁকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে তিনি আর্থিক লেনদেন, উচ্চবিত্ত গ্রাহকদের জন্য ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং পরে ক্রিপ্টোকারেন্সি–ভিত্তিক কার্যক্রমে যুক্ত হন।

কট্রেলের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় শুরু হয় ২০১৬ সালে।সেই বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী সমাবেশে নাইজেল ফারাজের সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। কিন্তু ওহাইও থেকে ফেরার পথে শিকাগো বিমানবন্দরে মার্কিন ফেডারেল এজেন্টরা তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, কয়েক বছর আগে তিনি ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে অর্থ পাচারের একটি পরিকল্পনায় অংশ নিয়েছিলেন। তদন্তে দেখা যায়, যাদের তিনি অর্থ পাচারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তারা আসলে ছদ্মবেশী ফেডারেল এজেন্ট ছিলেন। প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হলেও পরে তিনি ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতারণা (Wire Fraud)–সংক্রান্ত একটি অভিযোগ স্বীকার করেন। একটি সমঝোতার ভিত্তিতে দীর্ঘ কারাদণ্ডের পরিবর্তে তিনি প্রায় আট মাস কারাভোগ করেন।

কারাগার থেকে ফিরে নতুন অধ্যায়

২০১৭ সালের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার পর কট্রেল কিছু সময় নিজেকে জনসমক্ষে আড়ালে রাখলেও পরে আবার ব্যবসা ও রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে শুরু করেন। প্রথমদিকে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল তা ছিল “তারুণ্যের ভুল” এবং ভবিষ্যতে তিনি ভিন্নভাবে জীবন গড়তে চান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবারও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরিতে মনোযোগ দেন।

একই সময়ে নাইজেল ফারাজও তাঁকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেননি। বরং রাজনৈতিক অঙ্গনে ফারাজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের তালিকায় কট্রেলের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে থাকে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউকিপ (UKIP) যুগ থেকেই কট্রেল ধীরে ধীরে ফারাজের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। দলীয় তহবিল সংগ্রহ, বড় দাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক সফর—এসব ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ফারাজের ঘনিষ্ঠদের ভাষ্যমতে, কট্রেল শুধু প্রশাসনিক সহকারী ছিলেন না; তিনি অনেক সময় ব্যক্তিগত উপদেষ্টা, সফরসঙ্গী এবং সংকটকালীন সমন্বয়কারীর ভূমিকাও পালন করতেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ফারাজকে “ড্যাডি” বলেও সম্বোধন করতেন।

২০২৩ সালে নাইজেল ফারাজ নতুনভাবে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা শুরু করলে কট্রেলও আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেন। তাঁর অর্থায়নে কয়েকজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের কাজ ছিল—ফারাজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুনভাবে সাজানো; টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও এক্স (সাবেক টুইটার)-এ প্রচারণা বৃদ্ধি; অভিবাসন, মানবাধিকার আইন, সাংস্কৃতিক রাজনীতি ও জাতীয় পরিচয় ইস্যুতে নিয়মিত ভিডিও ও কনটেন্ট তৈরি; তরুণ ভোটারদের কাছে ফারাজের জনপ্রিয়তা বাড়ানো। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই ডিজিটাল টিমের সদস্যদের বেতনও দীর্ঘ সময় কট্রেলের ব্যক্তিগত অর্থ থেকেই পরিশোধ করা হয়েছিল।

এই সময় থেকেই ফারাজের ডিজিটাল উপস্থিতিতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। আগের তুলনায় অনেক বেশি পেশাদার ভিডিও, সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক বক্তব্য, দ্রুত সম্পাদিত ক্লিপ এবং তরুণদের উপযোগী কনটেন্ট প্রকাশ হতে থাকে। অভিবাসন, ছোট নৌকায় অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ, “নেট জিরো” নীতি, সাংস্কৃতিক বিতর্ক এবং আইনশৃঙ্খলা—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি ভিডিওগুলো লক্ষাধিক থেকে মিলিয়ন ভিউ পেতে শুরু করে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে ফারাজ অন্য অনেক ব্রিটিশ রাজনৈতিক নেতার তুলনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন।

২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন ঘোষণার পর কট্রেলের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণার পুরো সময় তিনি প্রায় নিয়মিতভাবে ফারাজের সঙ্গে ভ্রমণ করেছেন। প্রচারসভা, নিরাপত্তা সমন্বয়, সফর ব্যবস্থাপনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট এবং প্রচারণার নেপথ্যের বিভিন্ন কাজে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।

ফারাজের ওপর মিল্কশেক নিক্ষেপের বহুল আলোচিত ঘটনাতেও কট্রেল ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফারাজের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের পুরো প্রক্রিয়ায় কট্রেল শুধু একজন বন্ধু ছিলেন না; বরং অর্থায়ন, কৌশল, যোগাযোগ ও সাংগঠনিক সহায়তার মাধ্যমে তিনি নেপথ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। তবে নাইজেল ফারাজ ও রিফর্ম ইউকে এই অভিযোগগুলোর অনেকগুলোই অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, কট্রেলের দেওয়া সহায়তার বড় অংশই ছিল ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের ভিত্তিতে এবং সেগুলো সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী ঘোষণা করার বাধ্যবাধকতা ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রে সাজা ভোগের পর জর্জ কট্রেল আবারও আলোচনায় আসেন, তবে এবার রাজনীতির কারণে নয়; বরং ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন জুয়া ব্যবসার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। দ্য সানডে টাইমস–এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কট্রেল দীর্ঘদিন ধরে Tether.bet নামের একটি অফশোর অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্যবসার কাঠামো, অর্থ লেনদেনের পদ্ধতি এবং যুক্তরাজ্যে সম্ভাব্য কার্যক্রম নিয়ে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে।

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কট্রেল ইউরোপের ছোট দেশ মন্টিনিগ্রোতে চলে যান। সেখানে তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন বেটিং খাতে নতুন ব্যবসায় যুক্ত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে বলা হয়েছে, তিনি Tether.bet–এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। এটি এমন একটি অনলাইন বুকমেকার ও ক্যাসিনো প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ব্যবহারকারীরা খেলাধুলা, রাজনীতি এবং বিভিন্ন ঘটনার ওপর বড় অঙ্কের বাজি ধরতে পারতেন। প্ল্যাটফর্মটির নামকরণ করা হয় Tether নামের জনপ্রিয় স্টেবলকয়েনকে কেন্দ্র করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, Tether.bet কোনো একক কোম্পানি হিসেবে পরিচালিত হতো না। বরং এটি ছিল বিভিন্ন অফশোর প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি জটিল ব্যবসায়িক কাঠামো। এতে—মন্টিনিগ্রোতে অফিস ও ব্যাংকিং কার্যক্রম, কুরাকাওয়ের (Curaçao) জুয়া লাইসেন্স, সাইপ্রাসভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন অফশোর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মালিকানার কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ধরনের কাঠামোর ফলে প্রকৃত মালিকানা সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়।

Tether.bet নিজেদের এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপন করত, যেখানে প্রচলিত বুকমেকারদের তুলনায় অনেক বড় অঙ্কের বাজি ধরা সম্ভব। ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ জমা ও উত্তোলনের সুবিধাও ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্বোধনের সময় প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছিল যে, তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের একটি বাজি গ্রহণ করেছে। এছাড়া উচ্চ সম্পদশালী জুয়াড়ি, বিনিয়োগকারী এবং কিছু পেশাদার বেটিং সিন্ডিকেটও এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি ছিল যুক্তরাজ্যে প্ল্যাটফর্মটির সম্ভাব্য কার্যক্রম। দ্য সানডে টাইমস–এর দাবি, Tether.bet–এর যুক্তরাজ্যে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জুয়া লাইসেন্স ছিল না। তবুও কিছু ব্রিটিশ ব্যবহারকারী প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করতে পেরেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও দাবি করা হয়েছে, কয়েকজন মধ্যস্থতাকারী যুক্তরাজ্যের গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করতেন।

পরে সেই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া হতো। বাজিতে জয়ী হলে একই ধরনের প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরত দেওয়া হতো।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। এর একটি ছিল Global G Corp Ltd এবং অন্যটি Fispay Ltd। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কিছু অর্থ লেনদেন সম্পন্ন হতো। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একটি প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, কোম্পানিটি বাস্তবে কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেনি।

জুয়া আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি যুক্তরাজ্যে লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান দেশটির গ্রাহকদের কাছে জুয়া সেবা দিয়ে থাকে, তাহলে সেটি আইনি প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে অবৈধ জুয়া থেকে অর্জিত অর্থের লেনদেন অর্থ পাচারবিরোধী আইনেও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এসব বিষয়ে কট্রেলের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি।

কট্রেল এসব অভিযোগের অনেকটাই প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী— তিনি Tether.bet–এর জন্য যুক্তরাজ্যে গ্রাহক সংগ্রহ করেননি; অবৈধ জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনায় জড়িত ছিলেন না; এবং তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনেক দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আইনজীবীরা আরও বলেন, বিভিন্ন মামলায় যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোর বড় অংশই প্রমাণিত হয়নি।

অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, কট্রেলের এই ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চলাকালেই নাইজেল ফারাজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, ফারাজ একাধিকবার মন্টিনিগ্রো সফরে কট্রেলের অতিথি ছিলেন এবং সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

একই সময়ে ফারাজ যুক্তরাজ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে শুরু করেন। তিনি যুক্তরাজ্যকে বৈশ্বিক ক্রিপ্টো হাব হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে বক্তব্য দেন এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা করেন। তবে প্রতিবেদনে কোথাও দাবি করা হয়নি যে, ফারাজ Tether.bet–এর ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বরং অনুসন্ধানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কট্রেলের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং ফারাজের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে কোনো সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত (conflict of interest) ছিল কি না। এ বিষয়ে ফারাজ ও কট্রেল—উভয় পক্ষই কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা আদান-প্রদানের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

জর্জ কট্রেলকে ঘিরে দ্য সানডে টাইমস–এর অনুসন্ধানের শেষ অংশে উঠে এসেছে বড় অঙ্কের রাজনৈতিক অনুদান, বিলাসবহুল সম্পত্তি হস্তান্তর, যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমা (Presidential Pardon) পাওয়ার প্রচেষ্টা এবং পুরো ঘটনার বিষয়ে রিফর্ম ইউকে–এর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া। প্রতিবেদনটি দাবি করছে, এসব বিষয় মিলিয়ে নাইজেল ফারাজ ও তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জর্জ কট্রেলের সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি রাজনৈতিক, আর্থিক ও ব্যবসায়িক বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত ছিল। তবে ফারাজ, কট্রেল এবং রিফর্ম ইউকে এসব অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রত্যাখ্যান করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে জর্জ কট্রেলের মা ফিওনা কট্রেল রিফর্ম ইউকেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড অনুদান দেন। নির্বাচনী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই অনুদান তাঁকে দলটির অন্যতম বড় দাতায় পরিণত করে। তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে, ফিওনা নিজেকে একজন অবসরপ্রাপ্ত স্টাইলিস্ট হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে আদালতের নথিতে তাঁর পারিবারিক সম্পদের মূল্য প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ড উল্লেখ রয়েছে।

তবে এই অনুদানের উৎস বা অর্থায়নের প্রকৃতি নিয়ে অনুসন্ধানে প্রশ্ন তোলা হলেও কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। অনুসন্ধানের আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল রিফর্ম ইউকের কোষাধ্যক্ষ ও ব্যবসায়ী নিক ক্যান্ডি–র একটি বিলাসবহুল সম্পত্তি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চেলসিতে অবস্থিত প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি বাড়ির মালিকানা পরে জর্জ কট্রেলের নামে চলে যায়। ভূমি নিবন্ধন সংক্রান্ত নথিতে এই হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অর্থমূল্য শূন্য হিসেবে উল্লেখ ছিল। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও নিক ক্যান্ডি বলেন, এটি কোনো উপহার ছিল না।

তাঁর দাবি, গার্নসিভিত্তিক একটি অফশোর কোম্পানির শেয়ার লেনদেন এবং পূর্ববর্তী আর্থিক সমঝোতার অংশ হিসেবেই সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তন হয়েছিল। তবে তিনি কত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।

ট্রাম্পের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্জ কট্রেল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর পুরোনো ফৌজদারি দণ্ড মওকুফের জন্য প্রেসিডেন্টের ক্ষমা (Presidential Pardon) পাওয়ার চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বিরুদ্ধে ওয়্যার ফ্রড মামলার দণ্ড বহাল রয়েছে। এই প্রসঙ্গে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে, নাইজেল ফারাজের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গেও ফারাজের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে কোথাও বলা হয়নি যে ফারাজ কট্রেলের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়ে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন।

তদন্তে আরও বলা হয়েছে, কট্রেল সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন। প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক প্রচারণা, জনমত জরিপ, আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং কৌশলগত যোগাযোগ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার দাবি করছে। একই সময়ে তিনি অর্থ পাচারবিরোধী বিষয় নিয়ে একটি বইও প্রকাশ করেছেন। কট্রেলের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে এই বই লিখেছেন।

পুরো অনুসন্ধান প্রকাশের পর রিফর্ম ইউকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়। দলটির বক্তব্য, দ্য সানডে টাইমস–এর প্রতিবেদনটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভিত্তিহীন।

তাদের দাবি—প্রতিবেদনের বড় অংশ এমন সময়কার ঘটনা নিয়ে, যখন নাইজেল ফারাজ সংসদ সদস্য ছিলেন না। কোনো সংসদীয় নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি। ব্যক্তিগত বন্ধুত্বকে রাজনৈতিক অনুদান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পুরো অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য নতুন একটি পডকাস্ট প্রচার করা।ফারাজ নিজেও অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তিনি সংসদীয় নিয়ম ভঙ্গ করেননি এবং যেসব সুবিধা প্রকাশ করা প্রয়োজন ছিল, সেগুলো যথাযথভাবেই ঘোষণা করেছেন।

এই দীর্ঘ অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—একজন প্রভাবশালী রাজনীতিকের ব্যক্তিগত বন্ধু যদি দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপত্তা, আবাসন, কর্মী, ভ্রমণ কিংবা অন্যান্য সহায়তা প্রদান করেন, তাহলে সেগুলো কোন পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবে বিবেচিত হবে এবং কোন পর্যায়ে তা জনস্বার্থে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হয়ে উঠবে? সংসদীয় আচরণবিধি, রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই পুরো বিতর্ক আবর্তিত হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত নাইজেল ফারাজ, জর্জ কট্রেল কিংবা রিফর্ম ইউকের বিরুদ্ধে এই অনুসন্ধানের ভিত্তিতে কোনো নতুন ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি। তবে দ্য সানডে টাইমস–এর অনুসন্ধান যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অর্থায়ন, সংসদ সদস্যদের স্বার্থ ঘোষণা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের সীমা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে সংসদীয় স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনারের সম্ভাব্য তদন্ত কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা এই বিতর্কের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করতে পারে।

সূত্র: The Sunday Times–এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রকাশিত বক্তব্যের ভিত্তিতে