অক্সফোর্ডে ১৪১ দেশের মধ্যে একমাত্র পূর্ণ বৃত্তি পেলেন বাংলাদেশের নাজিফা
- প্রকাশঃ ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ২০:২২
- / 2
অক্সফোর্ড, ২৪ অক্টোবর, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ অর্থায়নে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশের নাজিফা বিনতে হারুন। ১৪১টি দেশের যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে প্রতিবছর একজনকে নির্বাচিত করা হয়, এমন একটি বৃত্তি অর্জন করেছেন তিনি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগে উন্নয়ন অধ্যয়নে এমফিল করছেন নাজিফা। তাঁর পড়াশোনার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করছে অক্সফোর্ডের ওডিআইডি ডিএসি বৃত্তি।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে আগ্রহ, একাডেমিক প্রস্তুতি, উন্নয়ন খাতে কাজের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার সক্ষমতা তাঁর এই অর্জনে ভূমিকা রেখেছে। নাজিফার শিক্ষাজীবনের পথচলায় একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি নেতৃত্ব, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক পরিবেশে বেড়ে উঠলেও পরিবার থেকে উদারভাবে চিন্তা করা ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন নাজিফা। ছোটবেলা থেকেই ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং তুলনামূলকভাবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব শিখেছেন তিনি। পরিবারের সঙ্গে দৈনন্দিন আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাজ, বৈষম্য ও মানুষের অধিকার নিয়ে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।
শিক্ষাজীবনের শুরুতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়লেও পরে বিশ্বব্যবস্থা, রাজনীতি ও মানবসমাজ নিয়ে আগ্রহ বাড়ে তাঁর। সেই আগ্রহ থেকে বাংলাদেশের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে রাজনীতি, দর্শন ও অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইতালির ইউনিভার্সিটি অব ত্রেন্তোতে এক সেমিস্টার অধ্যয়নের জন্য পূর্ণাঙ্গ ইরাসমাস প্লাস আইসিএম বৃত্তিও পান তিনি।
ইতালিতে বিনিময় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় সীমিত বাজেটে ইউরোপের ২১টি দেশ ভ্রমণ করেন নাজিফা। ভিন্ন সংস্কৃতি, সমাজ ও জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়। নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বিভিন্ন সামাজিক বাস্তবতা বোঝার অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর পড়াশোনা ও পেশাগত জীবনেও কাজে এসেছে।
স্নাতক শেষে উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে কাজ করেন নাজিফা। পরে যুক্ত হন মাই সোলি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে। বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীদের নিয়ে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রমের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। এসব কাজের মধ্য দিয়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবন, পারিবারিক পরিস্থিতি ও সামাজিক সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান তিনি। পাশাপাশি সামাজিক বিষয় নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
একাডেমিক ফলাফল ও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে ৩ দশমিক ৯-এর বেশি সিজিপিএ নিয়ে সুমা কাম লডে সম্মান অর্জন করেন নাজিফা। অক্সফোর্ডে আবেদনের সময় উন্নয়ন অধ্যয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত স্নাতক পর্যায়ের কোর্সগুলোও জীবনবৃত্তান্তে আলাদাভাবে তুলে ধরেন তিনি।
তবে তাঁর একাডেমিক ফলাফল সব সেমিস্টারে একই রকম ছিল না। কয়েকটি সেমিস্টারে ফলাফল খারাপ হওয়ায় সুযোগ অনুযায়ী কিছু কোর্স পুনরায় সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সেমিস্টারগুলোতে ভালো ফলাফলের মাধ্যমে নিজের একাডেমিক অবস্থান শক্তিশালী করেন। তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সামগ্রিক একাডেমিক প্রস্তুতির পাশাপাশি শেখার ধারাবাহিকতা এবং আগের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাবের শীর্ষ নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করেন নাজিফা। প্রথম বর্ষেই একটি একাডেমিক দলের নেতৃত্ব দেন এবং সহপাঠীদের পড়াশোনায় সহায়তা করতে পিয়ার টিউটর হিসেবেও কাজ করেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, দল পরিচালনা এবং অন্যদের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা তুলে ধরে।
আবেদনপত্রে কেবল দায়িত্ব ও পদবির তালিকা দেওয়ার পরিবর্তে প্রতিটি অভিজ্ঞতায় তিনি কী করেছেন এবং কী ধরনের অবদান রেখেছেন, তা ব্যাখ্যা করার ওপর জোর দেন নাজিফা। উন্নয়ন খাতে কাজ, কিশোরীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতাকে নিজের একাডেমিক আগ্রহের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করেন তিনি।
উদ্দেশ্যপত্রে গবেষণার লক্ষ্য স্পষ্ট করেন নাজিফা
অক্সফোর্ডে আবেদনের সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল উদ্দেশ্যপত্র লেখা। নিজের জীবনের সব ঘটনা তুলে ধরার পরিবর্তে কেন উন্নয়ন অধ্যয়ন করতে চান এবং কেন নির্দিষ্ট এই শিক্ষাক্রমটি তাঁর লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন, তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন তিনি।
নিজের আগ্রহের পেছনে থাকা অভিজ্ঞতা, সেসব অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া প্রশ্ন এবং ভবিষ্যতে সেগুলো নিয়ে আরও জানার আকাঙ্ক্ষাকে ধারাবাহিকভাবে সাজান নাজিফা। একই সঙ্গে তাঁর গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে অক্সফোর্ডের পাঠ্যক্রমের সম্পর্ক তুলে ধরেন। কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কী ধরনের জ্ঞান প্রয়োজন এবং শিক্ষাক্রমের কোন বিষয়গুলো সেই জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করবে, তা নির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন।
স্নাতক পর্যায়ের একটি কোর্সে শেখা বিশেষায়িত তত্ত্বকে নিজের গবেষণার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেন তিনি। মূল গবেষণা প্রশ্নকে চারটি উপপ্রশ্নে ভাগ করে প্রতিটির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কোর্সের সম্পর্ক দেখান। পাশাপাশি এই শিক্ষাক্রম থেকে কী শিখতে চান এবং নিজের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সহপাঠী ও একাডেমিক পরিবেশে কী অবদান রাখতে পারবেন, সেটিও তুলে ধরেন।
নাজিফার মতে, আবেদনপত্রে চমকপ্রদ শোনানোর চেষ্টা করার চেয়ে নির্ভুল ও সুনির্দিষ্ট হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করলেও যদি উদ্দেশ্যপত্রটি একইভাবে প্রাসঙ্গিক থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাক্রম সম্পর্কে যথেষ্ট নির্দিষ্টভাবে লেখা হয়নি বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। এ কারণে সাধারণ প্রশংসা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে নির্দিষ্ট গবেষণা প্রশ্ন, প্রাসঙ্গিক কোর্স এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেন তিনি।
সুপারিশপত্রের প্রস্তুতিও ছিল দীর্ঘমেয়াদি
অক্সফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের ক্ষেত্রে সুপারিশপত্রের গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করেন নাজিফা। স্নাতক পর্যায় থেকেই শিক্ষকদের সঙ্গে নিজের একাডেমিক আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতেন তিনি।
আবেদনের সময়সীমার প্রায় চার মাস আগে সম্ভাব্য সুপারিশকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নাজিফা। কোন শিক্ষাক্রমে আবেদন করছেন, কেন করছেন, তাঁর জীবনবৃত্তান্ত এবং উল্লেখযোগ্য কাজ ও অর্জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা শিক্ষকদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। এতে তাঁর আবেদন সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য পাওয়া এবং সুপারিশপত্র প্রস্তুত করা সহজ হয়।
অক্সফোর্ডে ভর্তি ও বৃত্তি পাওয়ার প্রক্রিয়া কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে প্রার্থীদের শিক্ষাক্রমে ভর্তির যোগ্যতা মূল্যায়ন করা হয়। ভর্তি প্রস্তাব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বৃত্তির শর্ত পূরণকারী প্রার্থীদের বিবেচনা করা হয়। এরপর বিভাগীয় পর্যায়ে বাছাই বা মনোনয়ন এবং বৃত্তি কমিটির মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নাজিফার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, অনেক বৃত্তির ক্ষেত্রে আলাদা আবেদনপত্রের পরিবর্তে মূল স্নাতকোত্তর আবেদনের সময়ই যোগ্য বৃত্তি নির্বাচনের সুযোগ থাকে। তবে প্রতিটি বৃত্তির নিজস্ব নিয়ম ও সময়সীমা যাচাই করা জরুরি।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নাজিফার পরামর্শ, আবেদন করার আগেই নিজের যোগ্যতা নিয়ে হাল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। ভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা কিংবা নিজ দেশের বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞানকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারলে এসব অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক শিক্ষাঙ্গনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করতে পারে।
একই সঙ্গে একটি পরিচিত বৃত্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক অর্থায়নের সুযোগ খোঁজার পরামর্শ দেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ, কলেজ এবং বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বৃত্তি সম্পর্কে খোঁজ রাখলে অর্থায়নের সম্ভাবনা বাড়ে। একটি বৃত্তি না পেলেও অন্য সুযোগ কাজে লাগানোর পথ খোলা থাকে।
নাজিফার অক্সফোর্ডযাত্রা তাই কেবল একটি মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তি অর্জনের গল্প নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, নিজের আগ্রহ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা, বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাডেমিক লক্ষ্যকে যুক্ত করা এবং আবেদনপত্রে নিজের সক্ষমতা যথাযথভাবে তুলে ধরার উদাহরণ। তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি প্রয়োজন সুস্পষ্ট লক্ষ্য, ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে অর্থবহভাবে উপস্থাপনের দক্ষতা।





























