যুদ্ধের পঞ্চম বছরে রাশিয়ার জনবল সংকট, অর্থ দিয়েও মিলছে না পর্যাপ্ত সেনা
- প্রকাশঃ ০২:২১:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
- / 5
ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে রাশিয়ার অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত জনবল সুবিধা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিপুল আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার পরও নতুন সেনা নিয়োগে প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের চাপ দেশটির অর্থনীতিতেও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে পুরুষদের জন্য বড় অঙ্কের নগদ বোনাস, ঋণ মওকুফ এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগের প্রচার চালানো হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে প্রায় ৮০ হাজার ডলার সমপরিমাণ বোনাস এবং ১ লাখ ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত ঋণ মওকুফের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
তবে রাশিয়ার অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক ইয়ানিস ক্লুগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সেনা নিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। এতে নতুন করে জনবল সংকটের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরু থেকে রাশিয়ার কৌশল ছিল দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মাধ্যমে ইউক্রেনকে চাপে রাখা। বৃহৎ জনসংখ্যা ও সামরিক শিল্পকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল মস্কো। তবে দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে সেই কৌশল এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইআইএসএসের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক নাইজেল গুল্ড-ডেভিস বলেন, “অর্থ যুদ্ধ করে না, যুদ্ধ করে মানুষ।” তাঁর মতে, রাশিয়ার ইতিহাসে এবারই প্রথম সরকার নাগরিকদের যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে বড় অঙ্কের অর্থ দিচ্ছে, যা অর্থনীতি ও জনবল উভয় ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে রাশিয়া এখন যত সেনা হারাচ্ছে, তার তুলনায় কম সংখ্যক নতুন সেনা নিয়োগ করতে পারছে।
রাশিয়া ইতোমধ্যে হাজার হাজার সাবেক বন্দিকে যুদ্ধে পাঠিয়েছে। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার সেনা, অভিবাসী শ্রমিক এবং বিদেশি নাগরিকদেরও সেনাবাহিনীতে যুক্ত করার চেষ্টা চালিয়েছে। সম্প্রতি নতুন একটি কর্মসূচির আওতায় ঋণে জর্জরিত ব্যক্তিদের জন্য ঋণ মওকুফের বিনিময়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধের কারণে কর্মক্ষম বয়সী বিপুল সংখ্যক পুরুষ সামরিক খাতে যুক্ত হওয়ায় রাশিয়ার বেসামরিক অর্থনীতিতেও শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিরক্ষা কারখানাগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করলেও নতুন শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমিক সংকটের কারণে মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ বাড়ছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্যের কিছু মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় পাঁচ লাখ রুশ সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়া বাধ্যতামূলক নিয়োগ এড়াতে বহু মানুষ দেশ ছেড়েছেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক মারিয়া স্নেগোভায়া বলেন, যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয় রাশিয়ার জন্য ক্রমেই বড় বোঝা হয়ে উঠছে। সামরিক ব্যয়, নিয়োগ খরচ এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা ক্রেমলিনকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বিশেষ করে ড্রোন যুদ্ধের ক্ষেত্রে অগ্রগতি, যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ইউক্রেন দাবি করেছে, তারা ড্রোন ও রোবট ব্যবহার করে কিছু সামরিক অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করেছে।
ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রুশ বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির হার নতুন নিয়োগের হারকে ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে ইউক্রেনের ড্রোন প্রযুক্তি ও কৌশলগত উদ্ভাবন রাশিয়ার জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রাশিয়াকে আরও কঠোর নিয়োগ নীতি গ্রহণ, বিদেশি শ্রমিক আনা অথবা নতুন করে বাধ্যতামূলক সেনা সমাবেশের মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।























