ঢাকা ০৩:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্যাশন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তরুণীদের কাছে পৌঁছাতেন এপস্টিন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • প্রকাশঃ ০২:২৯:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
  • / 5

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী ও অর্থলগ্নিকারী জেফরি এপস্টিন কীভাবে ফ্যাশন ও মডেলিং শিল্পের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তরুণীদের কাছে পৌঁছাতেন, সে বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) প্রকাশিত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন।

প্রকাশিত ইমেইল ও নথি অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মডেল স্কাউট, এজেন্সি নির্বাহী, নিয়োগকর্তা ও ফ্যাশন শিল্পের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তারা নিয়মিতভাবে তরুণী মডেলদের তথ্য, ছবি ও ব্যক্তিগত পরিচয় এপস্টিনের কাছে পাঠাতেন।

একটি ইমেইলে একজন নিয়োগকর্তা এক তরুণীকে এপস্টিনের জন্য “উপহার” হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্য ইমেইলগুলোতে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী সম্ভাবনাময় মডেলদের সম্পর্কেও আলোচনা পাওয়া যায়।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক। এপস্টিন অর্থ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং মার্কিন ভিসা পেতে সহায়তা করতেন। বিনিময়ে মডেলিং শিল্পের কিছু ব্যক্তি তাকে তরুণী ও বিদেশি নারীদের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ করে দিতেন। পরবর্তীতে এসব নারীর অনেকেই অভিযোগ করেন যে, তারা এপস্টিনের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

২০০৮ সালে যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও ফ্যাশন জগতের কিছু ব্যক্তি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন। কেউ তার সঙ্গে নতুন ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করেছেন, কেউ তাকে ফ্যাশন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, আবার কেউ তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

নথিতে অন্তত ছয়জন ফ্যাশন ও মডেলিং পেশাজীবীর তথ্য পাওয়া গেছে, যারা বারবার এপস্টিনের সঙ্গে তরুণী মডেলদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও তাদের অনেকের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি এবং তারা দাবি করেছেন, এপস্টিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তারা জানতেন না।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ফরাসি মডেল এজেন্ট জ্যঁ-লুক ব্রুনেলের নামও। তিনি দীর্ঘদিন এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ব্রুনেলের বিরুদ্ধে একাধিক নারী যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনলেও তিনি তা অস্বীকার করেছিলেন। ২০২০ সালে গ্রেপ্তারের পর ফ্রান্সের একটি কারাগারে তিনি আত্মহত্যা করেন।

একাধিক সাবেক মডেল অভিযোগ করেছেন, মডেলিং ক্যারিয়ারের সুযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছিল। কিন্তু পরে তারা এপস্টিনের ব্যক্তিগত সহকারী বা অন্য ভূমিকায় কাজ করতে বাধ্য হন এবং বছরের পর বছর নির্যাতনের শিকার হন।

সাবেক রুশ মডেল স্বেতলানা পোজিদায়েভা সিএনএনকে বলেন, নিউইয়র্কে মডেলিং ক্যারিয়ার গড়ার আশায় তিনি একটি মডেলিং এজেন্সির মাধ্যমে এপস্টিনের সঙ্গে পরিচিত হন। পরে তিনি তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং দীর্ঘ সময় নির্যাতনের শিকার হন বলে দাবি করেন।

নথিতে আরও দেখা গেছে, এপস্টিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মডেল স্কাউটদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন এবং সম্ভাবনাময় তরুণীদের সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য চাইতেন। কিছু ক্ষেত্রে এসব স্কাউটকে অর্থও প্রদান করা হতো।

মডেলদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন মডেল অ্যালায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা সারা জিফ বলেন, কিছু ক্ষেত্রে মডেলিং শিল্প মানবপাচারের আড়াল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। তার মতে, এপস্টিনের কর্মকাণ্ডে ফ্যাশন শিল্পের কোনো অংশ কীভাবে সহায়তা করেছিল, তা আরও গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

এদিকে ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশে এপস্টিনের মডেলিং-সংক্রান্ত যোগাযোগ ও সহযোগীদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত এখনো চলছে। কিছু সাবেক মডেল ইতোমধ্যে মানবপাচার ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নথিগুলো শুধু এপস্টিনের অপরাধচক্র নয়, বরং আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ও মডেলিং শিল্পের কিছু অংশে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান জবাবদিহির সংকটও সামনে নিয়ে এসেছে।

শেয়ার করুন

ফ্যাশন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তরুণীদের কাছে পৌঁছাতেন এপস্টিন

প্রকাশঃ ০২:২৯:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী ও অর্থলগ্নিকারী জেফরি এপস্টিন কীভাবে ফ্যাশন ও মডেলিং শিল্পের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তরুণীদের কাছে পৌঁছাতেন, সে বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) প্রকাশিত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন।

প্রকাশিত ইমেইল ও নথি অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মডেল স্কাউট, এজেন্সি নির্বাহী, নিয়োগকর্তা ও ফ্যাশন শিল্পের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তারা নিয়মিতভাবে তরুণী মডেলদের তথ্য, ছবি ও ব্যক্তিগত পরিচয় এপস্টিনের কাছে পাঠাতেন।

একটি ইমেইলে একজন নিয়োগকর্তা এক তরুণীকে এপস্টিনের জন্য “উপহার” হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্য ইমেইলগুলোতে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী সম্ভাবনাময় মডেলদের সম্পর্কেও আলোচনা পাওয়া যায়।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক। এপস্টিন অর্থ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং মার্কিন ভিসা পেতে সহায়তা করতেন। বিনিময়ে মডেলিং শিল্পের কিছু ব্যক্তি তাকে তরুণী ও বিদেশি নারীদের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ করে দিতেন। পরবর্তীতে এসব নারীর অনেকেই অভিযোগ করেন যে, তারা এপস্টিনের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

২০০৮ সালে যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও ফ্যাশন জগতের কিছু ব্যক্তি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন। কেউ তার সঙ্গে নতুন ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করেছেন, কেউ তাকে ফ্যাশন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, আবার কেউ তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

নথিতে অন্তত ছয়জন ফ্যাশন ও মডেলিং পেশাজীবীর তথ্য পাওয়া গেছে, যারা বারবার এপস্টিনের সঙ্গে তরুণী মডেলদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও তাদের অনেকের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি এবং তারা দাবি করেছেন, এপস্টিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তারা জানতেন না।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ফরাসি মডেল এজেন্ট জ্যঁ-লুক ব্রুনেলের নামও। তিনি দীর্ঘদিন এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ব্রুনেলের বিরুদ্ধে একাধিক নারী যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনলেও তিনি তা অস্বীকার করেছিলেন। ২০২০ সালে গ্রেপ্তারের পর ফ্রান্সের একটি কারাগারে তিনি আত্মহত্যা করেন।

একাধিক সাবেক মডেল অভিযোগ করেছেন, মডেলিং ক্যারিয়ারের সুযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছিল। কিন্তু পরে তারা এপস্টিনের ব্যক্তিগত সহকারী বা অন্য ভূমিকায় কাজ করতে বাধ্য হন এবং বছরের পর বছর নির্যাতনের শিকার হন।

সাবেক রুশ মডেল স্বেতলানা পোজিদায়েভা সিএনএনকে বলেন, নিউইয়র্কে মডেলিং ক্যারিয়ার গড়ার আশায় তিনি একটি মডেলিং এজেন্সির মাধ্যমে এপস্টিনের সঙ্গে পরিচিত হন। পরে তিনি তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং দীর্ঘ সময় নির্যাতনের শিকার হন বলে দাবি করেন।

নথিতে আরও দেখা গেছে, এপস্টিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মডেল স্কাউটদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন এবং সম্ভাবনাময় তরুণীদের সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য চাইতেন। কিছু ক্ষেত্রে এসব স্কাউটকে অর্থও প্রদান করা হতো।

মডেলদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন মডেল অ্যালায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা সারা জিফ বলেন, কিছু ক্ষেত্রে মডেলিং শিল্প মানবপাচারের আড়াল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। তার মতে, এপস্টিনের কর্মকাণ্ডে ফ্যাশন শিল্পের কোনো অংশ কীভাবে সহায়তা করেছিল, তা আরও গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

এদিকে ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশে এপস্টিনের মডেলিং-সংক্রান্ত যোগাযোগ ও সহযোগীদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত এখনো চলছে। কিছু সাবেক মডেল ইতোমধ্যে মানবপাচার ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নথিগুলো শুধু এপস্টিনের অপরাধচক্র নয়, বরং আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ও মডেলিং শিল্পের কিছু অংশে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান জবাবদিহির সংকটও সামনে নিয়ে এসেছে।