ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার পর বিশ্ব অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে কতটা সময় লাগতে পারে?
- প্রকাশঃ ১১:৫৫:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
- / 5
ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, যে নৌ পথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর বিশ্বের তেলের বাজার অনেকটা নির্ভর করছে । ছবি: সংগৃহীত
তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির একটি কাঠামোগত চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছে। চুক্তি কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি সচল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তির আভাস মিললেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ থামলেই বিশ্ব অর্থনীতি তাৎক্ষণিকভাবে আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল পরিবহন, জাহাজ চলাচল, বিমা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
হরমুজ প্রণালি কবে পুরোপুরি সচল হবে?
চুক্তির ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেল প্রবাহ পুনরায় শুরু হওয়া প্রয়োজন। তিনি জানান, শুক্রবার আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ঘোষণার পরও প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত রয়েছে। রোববারের পর মাত্র দুটি জাহাজ ওই পথ অতিক্রম করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যত অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ ছিল। এর ফলে প্রায় ২০০টি জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকে পড়ে। সমুদ্রে মাইন, ড্রোন হামলা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক শিপিং কোম্পানি এখনও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং বলেন, বর্তমান সমঝোতা স্থায়ী শান্তির সূচনা নাকি সাময়িক যুদ্ধবিরতি, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তাঁর মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ট্যাংকারগুলোকে স্বাভাবিক রুটে ফিরিয়ে আনা, তেল উৎপাদন ও পরিশোধন কেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা এবং জাহাজের বিমা-সংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে উঠতে সময় প্রয়োজন।
তেলের দাম কতটা কমতে পারে?
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। সংঘাত শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের নিচে। যুদ্ধ চলাকালে তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছায়।
চুক্তির ঘোষণার পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম নেমে এসেছে ৮৩ দশমিক ৫৫ ডলারে।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাবুব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ ফ্লোরেন্স স্মিট বলেন, চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বাজারে অস্থিরতা থাকতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমানে আলোচিত সমঝোতাটি মূলত ৬০ দিনের জন্য প্রণালি সচল রাখার পরিকল্পনা। এরপর পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলে বছরের শেষ নাগাদ তেলের বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
খাদ্যের দামেও কি প্রভাব পড়বে?
যুদ্ধের প্রভাবে শুধু জ্বালানি নয়, সার উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্ববাজারে ব্যবহৃত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার এবং সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
সংঘাতের সময় সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষি খাতে চাপ তৈরি হয়। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কুইলটার শেভিওটের জ্বালানি বিশ্লেষক মৌরিজিও কারুল্লির মতে, যুদ্ধবিরতি সারের বাজারে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামো মেরামত এবং সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অনেক অঞ্চলে ইতোমধ্যে কৃষি মৌসুম শুরু হয়ে যাওয়ায় সার সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হলেও চলতি মৌসুমে এর পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
শিপিং কোম্পানিগুলোর অবস্থান:
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কনটেইনার পরিবহন কোম্পানি মায়েরস্ক জানিয়েছে, তাদের পাঁচটি জাহাজ এখনও পারস্য উপসাগরে অবস্থান করছে। কোম্পানিটি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আপাতত মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন আনেনি।
অন্যদিকে জার্মানির হ্যাপাগ-লয়েড জানিয়েছে, তাদের চারটি জাহাজও এখনও আটকে রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর এবং সমুদ্রপথের মাইন অপসারণ সম্পন্ন হলে জাহাজগুলো সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সুদের হার ও বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব:
যুদ্ধের সময় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে। ফলে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।
বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছর সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দিলেও জ্বালানির বাজারে অস্থিরতার কারণে সেই পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এ জে বেলের পরিচালক রাস মোল্ড বলেন, যুদ্ধ চলাকালে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত অন্তত দুই দফা সুদের হার বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে নতুন সমঝোতার পর সেই আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তাঁর মতে, সুদের হার স্থিতিশীল থাকলে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং ভোক্তা ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে স্থবির হয়ে পড়া আবাসন বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিলেও প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে চুক্তির বাস্তবায়নের ওপর। হরমুজ প্রণালিতে নিয়মিত জাহাজ চলাচল, তেল ও গ্যাস সরবরাহের স্বাভাবিকতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির মাধ্যমেই বিশ্ব অর্থনীতি পূর্ণ স্বস্তি ফিরে পাবে।
তাই যুদ্ধ থামার খবরে বাজারে আশাবাদ তৈরি হলেও বিশ্ব অর্থনীতির সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধারে এখনও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।


























