ঢাকা ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বহুমেরু বিশ্বের পথে বাংলাদেশ: চীন, ভারত ও বৈশ্বিক শক্তির মাঝে ভারসাম্যের নতুন কূটনীতি

শাহারিয়া নয়ন
  • প্রকাশঃ ১১:৫৩:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
  • / 6

ছবি: প্রজন্ম কথা


আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময়ের একক শক্তিনির্ভর বিশ্বব্যবস্থা ধীরে ধীরে বহুমেরু কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, রাশিয়া এবং উদীয়মান অর্থনীতিগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় যুক্ত। এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের মতো মধ্যম আকারের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি সামনে এনেছে নতুন ধরনের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি এবং বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগকে এই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ আজকের বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রের জন্য একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ বা কার্যকর কৌশল নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চীন সফর বহুবার গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বেইজিং সফর কেবল কূটনৈতিক যোগাযোগের ঘটনা ছিল না; বরং তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাচ্ছে।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। তবে একই সময়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ইস্যু অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির অগ্রগতি না হওয়া, সীমান্তে হতাহতের ঘটনা, দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য বিকল্প কৌশলগত অংশীদার খুঁজে বের করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সেই প্রেক্ষাপটে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে সামনে এসেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য আকর্ষণীয়।

তবে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো মানেই অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত তার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। দেশের প্রধান রপ্তানি বাজার এখনো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ও শ্রমবাজারের প্রধান উৎস। ভারত ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের অন্যতম অংশীদার। অন্যদিকে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তি, শিল্প বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অতএব বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো বহুমুখী অংশীদারিত্বের নীতি অনুসরণ করা। কোনো একটি শক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি কোনো শক্তিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও বাস্তবসম্মত নয়।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে শিল্প সহযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে বাধ্য করছে। অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নতুন গন্তব্য খুঁজছে। বাংলাদেশ যদি দক্ষ মানবসম্পদ, উন্নত অবকাঠামো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এই পরিবর্তনের অন্যতম সুবিধাভোগী হতে পারে।

তবে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশকে এমন বিনিয়োগ চাইতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। কেবল ঋণনির্ভর অবকাঠামো প্রকল্প টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে না।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি কখনো দুর্বল অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে পারে না। সুশাসন, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত কৌশলগত শক্তির উৎস।

ইতিহাস দেখিয়েছে, যখন কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বহিরাগত শক্তিগুলো সহজেই সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ফলে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষার পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

আজকের বিশ্বে ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিযোগী শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। বাংলাদেশকে সেই ভারসাম্য এমনভাবে বজায় রাখতে হবে, যাতে কোনো পক্ষের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশে পরিণত না হয়ে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়।

“বাংলাদেশ ফার্স্ট” যদি সত্যিকার অর্থে একটি কার্যকর নীতি হতে চায়, তবে তার অর্থ হবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তখনই সফল হবে, যখন তা সরাসরি দেশের মানুষের কল্যাণে অবদান রাখবে।

বহুমেরু বিশ্বের এই নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশের সামনে সুযোগের দরজা উন্মুক্ত। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তববাদী কূটনীতি; নির্ভরতা নয়, প্রয়োজন ভারসাম্য; এবং সাময়িক লাভ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বাধীনতা নির্ধারিত হয় সে কতটা দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে তার ওপর। বাংলাদেশের জন্যও আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ঠিক সেখানেই।

শেয়ার করুন

বহুমেরু বিশ্বের পথে বাংলাদেশ: চীন, ভারত ও বৈশ্বিক শক্তির মাঝে ভারসাম্যের নতুন কূটনীতি

প্রকাশঃ ১১:৫৩:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

ছবি: প্রজন্ম কথা


আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময়ের একক শক্তিনির্ভর বিশ্বব্যবস্থা ধীরে ধীরে বহুমেরু কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, রাশিয়া এবং উদীয়মান অর্থনীতিগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় যুক্ত। এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের মতো মধ্যম আকারের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি সামনে এনেছে নতুন ধরনের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি এবং বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগকে এই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ আজকের বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রের জন্য একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ বা কার্যকর কৌশল নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চীন সফর বহুবার গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বেইজিং সফর কেবল কূটনৈতিক যোগাযোগের ঘটনা ছিল না; বরং তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাচ্ছে।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। তবে একই সময়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ইস্যু অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির অগ্রগতি না হওয়া, সীমান্তে হতাহতের ঘটনা, দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য বিকল্প কৌশলগত অংশীদার খুঁজে বের করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সেই প্রেক্ষাপটে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে সামনে এসেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য আকর্ষণীয়।

তবে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো মানেই অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত তার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। দেশের প্রধান রপ্তানি বাজার এখনো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ও শ্রমবাজারের প্রধান উৎস। ভারত ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের অন্যতম অংশীদার। অন্যদিকে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তি, শিল্প বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অতএব বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো বহুমুখী অংশীদারিত্বের নীতি অনুসরণ করা। কোনো একটি শক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি কোনো শক্তিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও বাস্তবসম্মত নয়।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে শিল্প সহযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে বাধ্য করছে। অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নতুন গন্তব্য খুঁজছে। বাংলাদেশ যদি দক্ষ মানবসম্পদ, উন্নত অবকাঠামো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এই পরিবর্তনের অন্যতম সুবিধাভোগী হতে পারে।

তবে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশকে এমন বিনিয়োগ চাইতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। কেবল ঋণনির্ভর অবকাঠামো প্রকল্প টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে না।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি কখনো দুর্বল অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে পারে না। সুশাসন, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত কৌশলগত শক্তির উৎস।

ইতিহাস দেখিয়েছে, যখন কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বহিরাগত শক্তিগুলো সহজেই সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ফলে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষার পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

আজকের বিশ্বে ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিযোগী শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। বাংলাদেশকে সেই ভারসাম্য এমনভাবে বজায় রাখতে হবে, যাতে কোনো পক্ষের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশে পরিণত না হয়ে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়।

“বাংলাদেশ ফার্স্ট” যদি সত্যিকার অর্থে একটি কার্যকর নীতি হতে চায়, তবে তার অর্থ হবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তখনই সফল হবে, যখন তা সরাসরি দেশের মানুষের কল্যাণে অবদান রাখবে।

বহুমেরু বিশ্বের এই নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশের সামনে সুযোগের দরজা উন্মুক্ত। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তববাদী কূটনীতি; নির্ভরতা নয়, প্রয়োজন ভারসাম্য; এবং সাময়িক লাভ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বাধীনতা নির্ধারিত হয় সে কতটা দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে তার ওপর। বাংলাদেশের জন্যও আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ঠিক সেখানেই।