মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়বেন ফিলিস্তিনপন্থি ওকাসিও-কর্টেজ?
- প্রকাশঃ ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১৮:৪৩
- / 3
ওয়াশিংটন, ১৬ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা): যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে ডেমোক্রেটিক পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছেন নিউইয়র্কের কংগ্রেসওম্যান আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। ৩৬ বছর বয়সী এই প্রগতিশীল নেত্রী এখনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দেননি। তবে সাম্প্রতিক বক্তব্য, জনসমর্থন এবং বিভিন্ন জরিপে তার অবস্থানকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
সম্প্রতি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রকফেলার মেমোরিয়াল চ্যাপেলে এক বক্তব্যে ওকাসিও-কর্টেজ বলেন, তার লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পদ পাওয়া নয়, বরং ‘দেশকে পরিবর্তন করা’। বক্তব্যের পর ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
জুলাইয়ে ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ারের একটি জরিপে সম্ভাব্য ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের মধ্যে ওকাসিও-কর্টেজ এগিয়ে ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার বড় অনুসারীভিত্তি রয়েছে। ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। প্রগতিশীল সংগঠন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ) থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সমর্থনও রয়েছে তার প্রতি।
ডিএসএর কো-চেয়ার আশিক সিদ্দিকি বলেন, ওকাসিও-কর্টেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়লে সংগঠনটির সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হবে। ২০২৮ সালের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে শ্রমজীবী মানুষের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান
ওকাসিও-কর্টেজের জাতীয় রাজনীতিতে উত্থানের শুরু ২০১৬ সালে। ওই বছর তিনি বার্নি স্যান্ডার্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। দুই বছর পর ২০১৮ সালের নিউইয়র্কের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে ১০ মেয়াদের কংগ্রেসম্যান জো ক্রাউলিকে পরাজিত করে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন তিনি।
সেসময় বারটেন্ডার ও ওয়েট্রেস হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা ওকাসিও-কর্টেজের নির্বাচনি প্রচারের আর্থিক সামর্থ্যও সীমিত ছিল। পরে প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর সহায়তায় তার রাজনৈতিক পরিসর দ্রুত বিস্তৃত হয়। প্রথম নির্বাচনি চক্রেই তার প্রচারে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহ হয়।
ওকাসিও-কর্টেজের সাবেক যোগাযোগ পরিচালক ও জাস্টিস ডেমোক্র্যাটসের সহপ্রতিষ্ঠাতা করবিন ট্রেন্টের ভাষ্য, ক্রাউলিকে পরাজিত করার পরপরই ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে তার নিজের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় প্রেসিডেন্ট, গভর্নর বা সিনেটর হওয়ার বিষয়টি ছিল না বলে জানান ট্রেন্ট।
তার মতে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন এবং অর্থনৈতিক সংকট ও দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরার সক্ষমতা ওকাসিও-কর্টেজের অন্যতম শক্তি।
রাজনৈতিক কৌশলবিদ ক্রিস স্কটও মনে করেন, বারটেন্ডার হিসেবে কাজ করার অতীত অভিজ্ঞতা তাকে বিভিন্ন শ্রেণির ভোটারের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ তৈরিতে সহায়তা করে। ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভোটারদের মিল খুঁজে পাওয়াও তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি কারণ বলে তিনি মনে করেন।
গাজা ইস্যুতে অবস্থান নিয়ে বিতর্ক
ফিলিস্তিন ইস্যুতেও ওকাসিও-কর্টেজের অবস্থান ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশে তাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
তবে ২০২৪ সালের ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে কমলা হ্যারিসের গাজা নীতির প্রশংসা করায় বামপন্থী কর্মীদের একাংশ তার সমালোচনা করে।
পরে এক সাক্ষাৎকারে ২০২০ সালের মহামারি-পরবর্তী সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব এবং ‘পুলিশের অর্থায়ন বন্ধ’ করার মতো কিছু বামপন্থী দাবির প্রসঙ্গে ওকাসিও-কর্টেজ বলেন, ওই সময়ের ‘ওয়োক’ রাজনীতি অতিরিক্ত উগ্র ছিল। তার এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক অবস্থান কিছুটা মধ্যপন্থী করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।
ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ওকাসিও-কর্টেজ প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হলে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে তাকে একাধিক পরিচিত নেতার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হতে পারে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় কমলা হ্যারিস, পিট বুটিগিগ, গ্যাভিন নিউজম, জন অসফ এবং প্রগতিশীল কংগ্রেসম্যান রো খান্নার নামও রয়েছে।
২০২৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হলে বয়সের দিক থেকে মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ থাকবে ওকাসিও-কর্টেজের। সেই ক্ষেত্রে তিনি থিওডোর রুজভেল্ট ও জন এফ কেনেডির রেকর্ড অতিক্রম করতে পারেন।
তবে জাতীয় পর্যায়ে প্রার্থী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে ডেমোক্রেটিক পার্টির বিভিন্ন অংশের সমর্থন পাওয়া তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিশেষ করে আফ্রিকান-আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বার্নি স্যান্ডার্সের ২০২০ সালের নির্বাচনি প্রচারের জাতীয় কো-চেয়ার নিনা টার্নারের মতে, ডিএসএ ও প্রগতিশীল গোষ্ঠীগুলো কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের কাছে যথেষ্ট কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারেনি। জাতীয় প্রার্থী হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করতে হলে ওকাসিও-কর্টেজকে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ ও সংগ্রামকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
দক্ষিণ ক্যারোলিনার ডেমোক্রেটিক কৌশলবিদ অ্যান্টুয়ান সিওরাইটের মতে, সাধারণ আমেরিকান পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে ওকাসিও-কর্টেজের আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো বিষয় সহজ ভাষায় তুলে ধরতে পারলে তা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
রিপাবলিকানদের আক্রমণও হতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিলে রিপাবলিকান ও ডানপন্থী গণমাধ্যমের সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন ওকাসিও-কর্টেজ। দীর্ঘদিন ধরে ডানপন্থী মহলের একটি অংশ তাকে উগ্র বামপন্থী ও ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে চিত্রিত করে আসছে।
সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসনাল যোগাযোগ পরিচালক তারা সেটমেয়ারের মতে, ওকাসিও-কর্টেজের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য তার রাজনৈতিক অবস্থানকে তুলনামূলক মধ্যপন্থী হিসেবে তুলে ধরার কৌশল হতে পারে। তবে নির্বাচনি প্রচারে তার পুরোনো বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানও সামনে আসতে পারে।
সেটমেয়ার মনে করেন, সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে নিউইয়র্কের সিনেট আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অভিজ্ঞতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে ওকাসিও-কর্টেজের জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে।
তবে ২০২৮ সালের নির্বাচন এখনো দুই বছর দূরে। ওকাসিও-কর্টেজ শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হবেন কি না, সে বিষয়ে তার পক্ষ থেকে এখনো কোনো ঘোষণা আসেনি। ফলে আপাতত তার সম্ভাব্য প্রার্থিতা রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যেই রয়েছে।

























