ঢাকা ০৮:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পুতিন আসলে কী চান

সাইফুল সামিন
  • প্রকাশঃ ০১:৪৯:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 10

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি: রয়টার্স


চার বছর পেরিয়ে পঞ্চম বছরে পা রেখেছে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার রুশ আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন ১ হাজার ৪৬১ দিনে গড়িয়েছে। যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা এখনো অনিশ্চিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এটিই সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শুরুতে রাশিয়া দ্রুত কিয়েভ দখলের আশা করেছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। দ্রুত বিজয়ের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে রূপ নেয় এবং যুদ্ধ পরিণত হয় দীর্ঘস্থায়ী, রক্তক্ষয়ী ও অনিশ্চিত সংঘাতে।

ভয়াবহ হতাহতের চিত্র

রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই হতাহতের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে। তবে পরস্পরবিরোধী পরিসংখ্যানেও ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা স্পষ্ট।

বিশ্লেষকদের অনুমান, এ পর্যন্ত সামরিক জনবল হতাহতের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছেছে।
ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফের হিসাবে, শুধু গত বছরই প্রায় ৪ লাখ ১৮ হাজার রুশ সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন। আর পুরো যুদ্ধে রাশিয়ার সেনা হতাহতের সংখ্যা ১২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) জানায়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাশিয়ার প্রায় ১২ লাখ সেনা হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৩ লাখ ২৫ হাজার নিহত।

অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, এ পর্যন্ত ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন। সিএসআইএসের হিসাবে, ইউক্রেনের সর্বোচ্চ ৬ লাখ সেনা হতাহতের শিকার হয়েছেন; এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার নিহত হতে পারেন।

বেসামরিক প্রাণহানির চিত্রও উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চার বছরে ১৫ হাজার ১৬৮ জন ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৪১ হাজার ৫৩৪ জন আহত হয়েছেন।

অগ্রগতি নাকি স্থবিরতা

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড বর্তমানে রাশিয়ার দখলে রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়াও রয়েছে।

চিন্তক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (ISW) জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউক্রেনের ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ ভূখণ্ড (প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটার) রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। শুধু ২০২৫ সালেই প্রায় ৪ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে রাশিয়া।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ অগ্রগতি এসেছে বিপুল প্রাণহানির বিনিময়ে এবং কৌশলগতভাবে তা বড় কোনো পরিবর্তন আনেনি। গত তিন বছরে যুদ্ধ কার্যত স্থবির হয়ে আছে।

শান্তি আলোচনা কত দূর

যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বছরের শেষে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠক হয়। জেলেনস্কি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার ৯০ শতাংশ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।

এরপর একাধিক দফা আলোচনা হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। চলতি মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সর্বশেষ বৈঠকও বড় সাফল্য ছাড়াই শেষ হয়। ভূখণ্ড প্রশ্নে মস্কো ও কিয়েভের অবস্থান এখনও বিপরীতমুখী।

জেলেনস্কি সম্প্রতি বিবিসিকে বলেন, এই যুদ্ধে ইউক্রেনের পরাজয়ের প্রশ্নই ওঠে না। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-এর প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির কঠোর বিরোধিতা করেন।

পুতিন কী চান

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের লক্ষ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন উত্তর আমেরিকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসির সিনিয়র ফেলো নিকোলাই পেট্রো। তাঁর মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পুতিনের শর্ত অপরিবর্তিত রয়েছে— ইউক্রেনকে নিরপেক্ষ ও পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত করা, ইউক্রেনকে নিরস্ত্রীকরণ, নাৎসিবাদমুক্ত ইউক্রেন গঠন।

এ ছাড়া ক্রিমিয়া, দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে আপস করতে রাজি নয় মস্কো। ইউক্রেন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও এসব অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারকে শর্ত হিসেবে দেখছে রাশিয়া।

নিকোলাই পেট্রোর মতে, এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করাই রাশিয়ার পূর্ণ বিজয়। এর কম কিছু অর্জিত হলে তা হবে আংশিক বিজয়। আর পশ্চিমা বিশ্ব সেটিকেই রাশিয়ার পরাজয় হিসেবে তুলে ধরবে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, পুতিন এমন কোনো চুক্তিতে সম্মত হবেন না, যা তাঁর দৃষ্টিতে রাশিয়ার পরাজয়ের শামিল।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

শেয়ার করুন

ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পুতিন আসলে কী চান

প্রকাশঃ ০১:৪৯:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি: রয়টার্স


চার বছর পেরিয়ে পঞ্চম বছরে পা রেখেছে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার রুশ আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন ১ হাজার ৪৬১ দিনে গড়িয়েছে। যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা এখনো অনিশ্চিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এটিই সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শুরুতে রাশিয়া দ্রুত কিয়েভ দখলের আশা করেছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। দ্রুত বিজয়ের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে রূপ নেয় এবং যুদ্ধ পরিণত হয় দীর্ঘস্থায়ী, রক্তক্ষয়ী ও অনিশ্চিত সংঘাতে।

ভয়াবহ হতাহতের চিত্র

রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই হতাহতের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে। তবে পরস্পরবিরোধী পরিসংখ্যানেও ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা স্পষ্ট।

বিশ্লেষকদের অনুমান, এ পর্যন্ত সামরিক জনবল হতাহতের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছেছে।
ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফের হিসাবে, শুধু গত বছরই প্রায় ৪ লাখ ১৮ হাজার রুশ সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন। আর পুরো যুদ্ধে রাশিয়ার সেনা হতাহতের সংখ্যা ১২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) জানায়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাশিয়ার প্রায় ১২ লাখ সেনা হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৩ লাখ ২৫ হাজার নিহত।

অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, এ পর্যন্ত ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন। সিএসআইএসের হিসাবে, ইউক্রেনের সর্বোচ্চ ৬ লাখ সেনা হতাহতের শিকার হয়েছেন; এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার নিহত হতে পারেন।

বেসামরিক প্রাণহানির চিত্রও উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চার বছরে ১৫ হাজার ১৬৮ জন ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৪১ হাজার ৫৩৪ জন আহত হয়েছেন।

অগ্রগতি নাকি স্থবিরতা

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড বর্তমানে রাশিয়ার দখলে রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়াও রয়েছে।

চিন্তক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (ISW) জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউক্রেনের ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ ভূখণ্ড (প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটার) রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। শুধু ২০২৫ সালেই প্রায় ৪ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে রাশিয়া।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ অগ্রগতি এসেছে বিপুল প্রাণহানির বিনিময়ে এবং কৌশলগতভাবে তা বড় কোনো পরিবর্তন আনেনি। গত তিন বছরে যুদ্ধ কার্যত স্থবির হয়ে আছে।

শান্তি আলোচনা কত দূর

যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বছরের শেষে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠক হয়। জেলেনস্কি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার ৯০ শতাংশ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।

এরপর একাধিক দফা আলোচনা হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। চলতি মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সর্বশেষ বৈঠকও বড় সাফল্য ছাড়াই শেষ হয়। ভূখণ্ড প্রশ্নে মস্কো ও কিয়েভের অবস্থান এখনও বিপরীতমুখী।

জেলেনস্কি সম্প্রতি বিবিসিকে বলেন, এই যুদ্ধে ইউক্রেনের পরাজয়ের প্রশ্নই ওঠে না। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-এর প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির কঠোর বিরোধিতা করেন।

পুতিন কী চান

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের লক্ষ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন উত্তর আমেরিকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসির সিনিয়র ফেলো নিকোলাই পেট্রো। তাঁর মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পুতিনের শর্ত অপরিবর্তিত রয়েছে— ইউক্রেনকে নিরপেক্ষ ও পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত করা, ইউক্রেনকে নিরস্ত্রীকরণ, নাৎসিবাদমুক্ত ইউক্রেন গঠন।

এ ছাড়া ক্রিমিয়া, দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে আপস করতে রাজি নয় মস্কো। ইউক্রেন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও এসব অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারকে শর্ত হিসেবে দেখছে রাশিয়া।

নিকোলাই পেট্রোর মতে, এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করাই রাশিয়ার পূর্ণ বিজয়। এর কম কিছু অর্জিত হলে তা হবে আংশিক বিজয়। আর পশ্চিমা বিশ্ব সেটিকেই রাশিয়ার পরাজয় হিসেবে তুলে ধরবে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, পুতিন এমন কোনো চুক্তিতে সম্মত হবেন না, যা তাঁর দৃষ্টিতে রাশিয়ার পরাজয়ের শামিল।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”