আগামী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের উত্তরসূরি কে—ভ্যান্স, নাকি রুবিও?
- প্রকাশঃ ০৮ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৫
- / 7
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসেবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী কে হতে পারেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা জোরালো হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের প্রশংসা বাড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। এতে রিপাবলিকান মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে ভ্যান্সের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর বিভিন্ন কারণে আলোচনায় রয়েছেন জেডি ভ্যান্স। নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে লেখা নতুন স্মৃতিকথার প্রচার, টেলিভিশনে নিয়মিত উপস্থিতি এবং ইরান সংকট নিরসনে কূটনৈতিক আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা ট্রাম্পের নজর কেড়েছে।
এর আগে ট্রাম্প ঘনিষ্ঠদের কাছে প্রায়ই জানতে চাইতেন, তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে জেডি ভ্যান্স নাকি মার্কো রুবিও বেশি উপযুক্ত। তবে ট্রাম্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এখন সেই প্রশ্ন আর করছেন না। বরং তিনি প্রায়ই ভ্যান্সের কাজের প্রশংসা করছেন।
ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র অ্যাক্সিওসকে জানায়, এখন প্রেসিডেন্ট আর জিজ্ঞেস করেন না, “জেডি নাকি মার্কো?” কিংবা “জেডি কেমন করছে?” বরং তিনি বলেন, “জেডিকে তো দারুণ লাগছে, তাই না?”
ট্রাম্পের এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বলেন, জেডি ভ্যান্স নিজের যোগ্যতায় এই অবস্থানে পৌঁছাচ্ছেন এবং ট্রাম্পও সেটি লক্ষ্য করছেন।
একই উপদেষ্টা আরও বলেন, মার্কো রুবিও এমনিতেই প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিকল্পনা করেননি। বর্তমানে সেই সম্ভাবনাও আরও কম বলে মনে হচ্ছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে দ্য ইনডিপেনডেন্ট হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপেও দেখা গেছে, ২০২৮ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে সম্ভাব্য দৌড়ে জেডি ভ্যান্স বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
তবে ভ্যান্স জানিয়েছেন, তিনি এখনই ২০২৮ সালের নির্বাচন নিয়ে ভাবছেন না। তাঁর প্রধান লক্ষ্য নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে কাজ করা।
গত জুনে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ভ্যান্স বলেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী উষা পরিবারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিয়ে সময়মতো আলোচনা করবেন। প্রয়োজনের আগে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষপাতী নন বলেও জানান তিনি।
২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে গত বছরও ভ্যান্সকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তখনও তিনি একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরেন।
সে সময় তিনি বলেন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করতে পারলে ২০২৭ সালে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করা যাবে। দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই পরবর্তী নির্বাচনের প্রচার শুরু করা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
২০২৮ সালের সম্ভাব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে ভ্যান্স ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমর্থনও পেয়েছেন। নিহত রক্ষণশীল কর্মী চার্লি কার্কের স্ত্রী এরিকা কার্ক প্রকাশ্যে তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন। চার্লি কার্ক প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক সংগঠন টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ রিপাবলিকান পার্টির তরুণ ভোটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের সমর্থন পেলেও ভ্যান্সের সামনে কয়েকটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
ইরান সংকট নিরসনে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের একটি অংশ ইরানে সামরিক পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে নেয়নি। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্যও অনেক ভোটার এই সংঘাতকে দায়ী করছেন।
গত মাসে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প রসিকতা করে বলেছিলেন, “এটা যদি কাজ না করে, তাহলে এর দোষ আমি জেডির ঘাড়েই চাপাব।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার নজির রয়েছে। ফলে আগামী দুই বছরে নানা কারণে ভ্যান্সও তাঁর আস্থার বাইরে চলে যেতে পারেন।
ভ্যান্সের সঙ্গে প্রযুক্তি খাতের কেন্দ্র সিলিকন ভ্যালি এবং ডানপন্থী বিনিয়োগকারী পিটার থিয়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের রানিং মেট হিসেবে ভ্যান্সকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে থিয়েলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ায় ধনকুবেরদের ওপর নতুন কর আরোপের প্রস্তাব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থানের পরিবর্তন এবং আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি ভোটারদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে ভ্যান্সের ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত ভ্যান্স সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পোপের সঙ্গে প্রকাশ্য মতপার্থক্যে জড়িয়েছেন। এ অবস্থান ট্রাম্পের খ্রিষ্টান সমর্থকদের একটি অংশের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অনলাইনেও ভ্যান্স প্রায়ই বিদ্রূপের শিকার হন। সমালোচকেরা তাঁর বিকৃত চেহারার ছবি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট করেন।
তবে তাঁর পক্ষে কয়েকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি বড় অঙ্কের নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহে সক্ষম এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে বিস্তৃত যোগাযোগ গড়ে তুলেছেন, যা আধুনিক মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়।
অপরদিকে মার্কো রুবিওরও নিজস্ব কিছু শক্তিশালী দিক রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি বিতর্কিত নীতিগত বিরোধ থেকে তিনি দূরে থাকতে পেরেছেন। পাশাপাশি কিউবার বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে চলা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একটি পররাষ্ট্রনৈতিক লক্ষ্য পূরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এ ধরনের সাফল্য বিশেষ করে রুবিওর নিজ অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডার কিউবান প্রবাসীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হতে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে এই সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক।
এ ছাড়া স্প্যানিশভাষী লাতিনো এবং কিউবান অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে রুবিও ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতির কারণে দূরে সরে যাওয়া কিছু লাতিনো ভোটারের সমর্থনও পুনরায় আকর্ষণ করতে পারেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।


























