ঢাকা ০৫:০৩ , Thu, ০৯ Jul ২০২৬

তালাক ও হিল্লা বিয়ে: কোনো খেল-তামাশার বিষয় নয়

  • প্রকাশঃ ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৫
  • / 6
ছবি: সংগৃহীত

তালাক মানবসমাজে একটি অপ্রিয় সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। যদিও তালাক আল্লাহ্‌ অনুমোদিত একটি বৈধ প্রক্রিয়া, তবু সমাজে তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষের ব্যক্তিত্বকে খাটো করে দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। দেশ-কালভেদে তালাক প্রক্রিয়ার ভিন্নতা থাকলেও পৃথিবীতে তালাকমুক্ত কোনো দেশ নেই। বিচ্ছেদহীন দাম্পত্য সমাজ কোনো দিনই সম্ভব হবে না বলেই হয়তো আল্লাহ মানুষের জন্য নাজিল করা বিধানে এটি অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তালাক-পরবর্তী নারী-পুরুষের জীবনের সম্ভাব্য আর্থিক ও সামাজিক সংকট সম্পর্কে মানবমনের নানা প্রশ্নের জবাবও কোরআনে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

তালাক-সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইসলাম তালাকের অনুমতি দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন যুক্তির মাধ্যমে তালাককে নিরুৎসাহিতও করেছে। অপরদিকে ক্ষমা, ধৈর্য ও পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছে।

বাস্তবে দেখা যায়, দেশে দেশে তালাকের ক্ষেত্রে স্রষ্টার গাইডলাইন পাশ কাটিয়ে মানুষের তৈরি বিধান অনুসারে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনেক মুসলিম দেশেও স্রষ্টার বিধানের পরিবর্তে মানুষের তৈরি আইনেই তালাক ও তালাক-পরবর্তী বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হচ্ছে।

অথচ আল্লাহ স্পষ্টভাবে মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর বিধান কালজয়ী ও ইনসাফপূর্ণ।

“আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম। তাঁর বাক্যের কোনো পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
(সূরা আনআম: আয়াত ১১৫)

তালাকের পর্যায়ক্রমিক ধাপগুলো বিশ্বাসী মানুষদের জন্য কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তালাকের সর্বশেষ ধাপে একজন তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে বিবাহ এবং পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবে সেই বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটলে পূর্বের স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিচ্ছেদপ্রাপ্ত নারীর এই বিবাহের বিষয়টি সমাজে হিল্লা বিয়ে নামে পরিচিত।

যারা কোরআনের বিধানে বিশ্বাসী নন কিংবা তালাক-সংক্রান্ত বিধিবিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না, তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হিল্লা বিয়ে নিয়ে নানা অপব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন এবং ইসলামকে একটি অপূর্ণ ও অনুপযোগী জীবনদর্শন হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। কোরআনে তালাক প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপে হিল্লা বিয়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত সূরা বাকারার দুটি আয়াত একসঙ্গে পড়লে মানবমনের জিজ্ঞাসার উত্তর সেখানেই পাওয়া যায়।

“তালাক দুবার পর্যন্ত। তারপর হয় নিয়মানুযায়ী রাখবে, না হয় সহৃদয়তার সঙ্গে বর্জন করবে…”
(সূরা বাকারা: আয়াত ২২৯)

“তারপর যদি সেই স্ত্রীকে (তৃতীয়বার) তালাক দেওয়া হয়, তবে সে স্ত্রী যে পর্যন্ত তাকে ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হয়, ততক্ষণ সে তার জন্য হালাল নয়। অতঃপর যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই পুনরায় বিবাহে কোনো পাপ নেই, যদি তারা আল্লাহর বিধান বজায় রাখার ইচ্ছা রাখে।”
(সূরা বাকারা: আয়াত ২৩১)

ইসলামে তালাক ও হিল্লা বিয়ে কোনো খেল-তামাশার বিষয় নয়। তালাকের দ্বিতীয় ধাপের পরও স্বামী-স্ত্রীকে সংসারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত তাঁদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আয়াতটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, স্বামীকে এ পর্যায়ে সতর্ক করা হয়েছে যে, তিনি যদি স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন, তাহলে তাঁর অন্য কারও সঙ্গে বিবাহ হয়ে যেতে পারে এবং তাঁকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যাবে।

তালাক প্রক্রিয়ার এ পর্যায়ে একজন স্বামী উপলব্ধি করেন যে, তাঁর স্ত্রী অন্য একজন পুরুষের সংসারে চলে যেতে পারেন। পুরুষে পুরুষে পার্থক্য থাকলেও এমন পরিস্থিতিতে অনেক স্বামী স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে বিবাহের সুযোগ না দিয়ে সংসারে ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী হতে পারেন।

হিল্লা বিয়ে অর্থাৎ দ্বিতীয় পুরুষের সঙ্গে বিবাহ, তারপর স্বাভাবিকভাবে সেই বিবাহের অবসান অথবা দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর পুনরায় প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহ; পুরো বিষয়টিই অত্যন্ত অনিশ্চিত। এভাবেই আল্লাহ চিন্তাশীল মানুষদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহর এ বিধানকে পাশ কাটিয়ে একসঙ্গে তিনবার ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়, সমাজে প্রচলিত এই বিশ্বাস লেখকের মতে কোরআনের বিধানের পরিপন্থী এবং মানুষের প্রতি অবিচারের শামিল।

ইসলাম বিয়েকে সহজ করেছে। পুরুষের সামর্থ্য অনুযায়ী মোহরানা নির্ধারণ এবং প্রাপ্তবয়স্ক দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী থাকলেই মুসলিম রীতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে ঈমানদার পুরুষের জন্য স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। মমতা, ক্ষমা ও ধৈর্যের মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। বাড়াবাড়ি, কষ্ট দেওয়া এবং সীমা লঙ্ঘনের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। যদিও প্রচলিত আইনে এসব বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেখা যায় না।

দাম্পত্য বিরোধ দেখা দিলে ইসলাম শুরুতেই কাউকে তালাকের অনুমতি দেয় না। তালাক দেওয়ার আগে স্ত্রীর ইদ্দতের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়, তিনি গর্ভবতী কি না তা নিশ্চিত হতে হয় এবং আল্লাহ নির্ধারিত অপেক্ষাকাল অতিক্রম করতে হয়। সামান্য বিরোধে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত আল্লাহর বিধানের পরিপন্থী।

“পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল…”
(সূরা নিসা: আয়াত ৩৪)

নারী-পুরুষ একই স্রষ্টার সৃষ্টি। তাঁদের প্রত্যেকের জন্য যা প্রয়োজন, আল্লাহ সেই অনুযায়ী বিধান দিয়েছেন। দাম্পত্য বিরোধে স্বামীকে স্ত্রীকে উপদেশ দিতে, প্রয়োজনে শয্যা পৃথক করতে এবং সর্বশেষ পর্যায়ে মৃদু শাসনের কথা বলা হয়েছে। তবে স্ত্রীকে স্বামীকে শাসন করতে বলা হয়নি, কিংবা স্ত্রীর সম্পদ থেকে স্বামীর ভরণপোষণের দায়িত্বও আরোপ করা হয়নি।

জগতের সব স্ত্রীই স্বামীর অবাধ্য নন, আবার সব স্বামীও আদর্শ নন। তবে যেসব ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে, সে বিষয়েও কোরআনে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কোনো স্বামী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মোটিভেশনাল বক্তা হয়েও স্ত্রীর কাছে তুচ্ছজ্ঞান হতে পারেন। হাজার মানুষের নেতা হয়েও নিজ সংসারে গুরুত্বহীন হয়ে পড়তে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে স্বামীর উপদেশের চেয়ে স্ত্রীর বাবা, ভাই বা পরিবারের অন্য সদস্যের পরামর্শ অধিক কার্যকর হতে পারে। তাই সূরা নিসার পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বিরোধ নিষ্পত্তির আরেকটি উপায় নির্দেশ করেছেন।

“আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত কর…”
(সূরা নিসা: আয়াত ৩৫)

অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টার পরও যদি কোনো সমাধান না হয়, তবে সে ক্ষেত্রে তালাকই বৈধ প্রক্রিয়া। সৃষ্টিগতভাবে সীমিত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের মনে তালাক-পরবর্তী জীবনের বিষয়ে যাতে হতাশা না আসে, সে জন্য আল্লাহ আশ্বাস দিয়েছেন,

“আর যদি তারা উভয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে আল্লাহ প্রত্যেককে তাঁর প্রাচুর্য দ্বারা অভাবমুক্ত করবেন।”
(সূরা নিসা: আয়াত ১৩০)

ইসলাম উপার্জনের দায়িত্ব স্বামীর ওপর দিয়েছে। তবে আধুনিক জীবনে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে অনেক পরিবারে স্ত্রীও উপার্জনে অংশ নেন। সংসার ভেঙে গেলে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সে কারণেই আল্লাহ মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন,

“নিশ্চয় তোমার রব যাকে ইচ্ছা তার জন্য রিজিক প্রশস্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সীমিত করেন।”
(সূরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ৩০)

“এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যে উৎস সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।”
(সূরা আত-তালাক: আয়াত ৩)

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি লেখকের ব্যক্তিগত মতামত ও ব্যাখ্যা। এটি কোরআনে বর্ণিত তালাক-সংক্রান্ত কোনো চূড়ান্ত ধর্মীয় সিদ্ধান্ত নয় এবং কাউকে তালাকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যেও লেখা নয়।

লেখক: মানবিক সংগঠক ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ক লেখক।

❤️
👏
🙂
😞

তালাক ও হিল্লা বিয়ে: কোনো খেল-তামাশার বিষয় নয়

প্রকাশঃ ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৫

তালাক মানবসমাজে একটি অপ্রিয় সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। যদিও তালাক আল্লাহ্‌ অনুমোদিত একটি বৈধ প্রক্রিয়া, তবু সমাজে তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষের ব্যক্তিত্বকে খাটো করে দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। দেশ-কালভেদে তালাক প্রক্রিয়ার ভিন্নতা থাকলেও পৃথিবীতে তালাকমুক্ত কোনো দেশ নেই। বিচ্ছেদহীন দাম্পত্য সমাজ কোনো দিনই সম্ভব হবে না বলেই হয়তো আল্লাহ মানুষের জন্য নাজিল করা বিধানে এটি অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তালাক-পরবর্তী নারী-পুরুষের জীবনের সম্ভাব্য আর্থিক ও সামাজিক সংকট সম্পর্কে মানবমনের নানা প্রশ্নের জবাবও কোরআনে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

তালাক-সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইসলাম তালাকের অনুমতি দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন যুক্তির মাধ্যমে তালাককে নিরুৎসাহিতও করেছে। অপরদিকে ক্ষমা, ধৈর্য ও পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছে।

বাস্তবে দেখা যায়, দেশে দেশে তালাকের ক্ষেত্রে স্রষ্টার গাইডলাইন পাশ কাটিয়ে মানুষের তৈরি বিধান অনুসারে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনেক মুসলিম দেশেও স্রষ্টার বিধানের পরিবর্তে মানুষের তৈরি আইনেই তালাক ও তালাক-পরবর্তী বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হচ্ছে।

অথচ আল্লাহ স্পষ্টভাবে মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর বিধান কালজয়ী ও ইনসাফপূর্ণ।

“আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম। তাঁর বাক্যের কোনো পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
(সূরা আনআম: আয়াত ১১৫)

তালাকের পর্যায়ক্রমিক ধাপগুলো বিশ্বাসী মানুষদের জন্য কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তালাকের সর্বশেষ ধাপে একজন তালাকপ্রাপ্ত নারীকে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে বিবাহ এবং পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবে সেই বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটলে পূর্বের স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিচ্ছেদপ্রাপ্ত নারীর এই বিবাহের বিষয়টি সমাজে হিল্লা বিয়ে নামে পরিচিত।

যারা কোরআনের বিধানে বিশ্বাসী নন কিংবা তালাক-সংক্রান্ত বিধিবিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না, তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হিল্লা বিয়ে নিয়ে নানা অপব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন এবং ইসলামকে একটি অপূর্ণ ও অনুপযোগী জীবনদর্শন হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। কোরআনে তালাক প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপে হিল্লা বিয়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত সূরা বাকারার দুটি আয়াত একসঙ্গে পড়লে মানবমনের জিজ্ঞাসার উত্তর সেখানেই পাওয়া যায়।

“তালাক দুবার পর্যন্ত। তারপর হয় নিয়মানুযায়ী রাখবে, না হয় সহৃদয়তার সঙ্গে বর্জন করবে…”
(সূরা বাকারা: আয়াত ২২৯)

“তারপর যদি সেই স্ত্রীকে (তৃতীয়বার) তালাক দেওয়া হয়, তবে সে স্ত্রী যে পর্যন্ত তাকে ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হয়, ততক্ষণ সে তার জন্য হালাল নয়। অতঃপর যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই পুনরায় বিবাহে কোনো পাপ নেই, যদি তারা আল্লাহর বিধান বজায় রাখার ইচ্ছা রাখে।”
(সূরা বাকারা: আয়াত ২৩১)

ইসলামে তালাক ও হিল্লা বিয়ে কোনো খেল-তামাশার বিষয় নয়। তালাকের দ্বিতীয় ধাপের পরও স্বামী-স্ত্রীকে সংসারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত তাঁদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আয়াতটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, স্বামীকে এ পর্যায়ে সতর্ক করা হয়েছে যে, তিনি যদি স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন, তাহলে তাঁর অন্য কারও সঙ্গে বিবাহ হয়ে যেতে পারে এবং তাঁকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যাবে।

তালাক প্রক্রিয়ার এ পর্যায়ে একজন স্বামী উপলব্ধি করেন যে, তাঁর স্ত্রী অন্য একজন পুরুষের সংসারে চলে যেতে পারেন। পুরুষে পুরুষে পার্থক্য থাকলেও এমন পরিস্থিতিতে অনেক স্বামী স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে বিবাহের সুযোগ না দিয়ে সংসারে ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী হতে পারেন।

হিল্লা বিয়ে অর্থাৎ দ্বিতীয় পুরুষের সঙ্গে বিবাহ, তারপর স্বাভাবিকভাবে সেই বিবাহের অবসান অথবা দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর পুনরায় প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহ; পুরো বিষয়টিই অত্যন্ত অনিশ্চিত। এভাবেই আল্লাহ চিন্তাশীল মানুষদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহর এ বিধানকে পাশ কাটিয়ে একসঙ্গে তিনবার ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়, সমাজে প্রচলিত এই বিশ্বাস লেখকের মতে কোরআনের বিধানের পরিপন্থী এবং মানুষের প্রতি অবিচারের শামিল।

ইসলাম বিয়েকে সহজ করেছে। পুরুষের সামর্থ্য অনুযায়ী মোহরানা নির্ধারণ এবং প্রাপ্তবয়স্ক দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী থাকলেই মুসলিম রীতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে ঈমানদার পুরুষের জন্য স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। মমতা, ক্ষমা ও ধৈর্যের মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। বাড়াবাড়ি, কষ্ট দেওয়া এবং সীমা লঙ্ঘনের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। যদিও প্রচলিত আইনে এসব বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেখা যায় না।

দাম্পত্য বিরোধ দেখা দিলে ইসলাম শুরুতেই কাউকে তালাকের অনুমতি দেয় না। তালাক দেওয়ার আগে স্ত্রীর ইদ্দতের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়, তিনি গর্ভবতী কি না তা নিশ্চিত হতে হয় এবং আল্লাহ নির্ধারিত অপেক্ষাকাল অতিক্রম করতে হয়। সামান্য বিরোধে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত আল্লাহর বিধানের পরিপন্থী।

“পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল…”
(সূরা নিসা: আয়াত ৩৪)

নারী-পুরুষ একই স্রষ্টার সৃষ্টি। তাঁদের প্রত্যেকের জন্য যা প্রয়োজন, আল্লাহ সেই অনুযায়ী বিধান দিয়েছেন। দাম্পত্য বিরোধে স্বামীকে স্ত্রীকে উপদেশ দিতে, প্রয়োজনে শয্যা পৃথক করতে এবং সর্বশেষ পর্যায়ে মৃদু শাসনের কথা বলা হয়েছে। তবে স্ত্রীকে স্বামীকে শাসন করতে বলা হয়নি, কিংবা স্ত্রীর সম্পদ থেকে স্বামীর ভরণপোষণের দায়িত্বও আরোপ করা হয়নি।

জগতের সব স্ত্রীই স্বামীর অবাধ্য নন, আবার সব স্বামীও আদর্শ নন। তবে যেসব ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে, সে বিষয়েও কোরআনে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কোনো স্বামী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মোটিভেশনাল বক্তা হয়েও স্ত্রীর কাছে তুচ্ছজ্ঞান হতে পারেন। হাজার মানুষের নেতা হয়েও নিজ সংসারে গুরুত্বহীন হয়ে পড়তে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে স্বামীর উপদেশের চেয়ে স্ত্রীর বাবা, ভাই বা পরিবারের অন্য সদস্যের পরামর্শ অধিক কার্যকর হতে পারে। তাই সূরা নিসার পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বিরোধ নিষ্পত্তির আরেকটি উপায় নির্দেশ করেছেন।

“আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত কর…”
(সূরা নিসা: আয়াত ৩৫)

অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টার পরও যদি কোনো সমাধান না হয়, তবে সে ক্ষেত্রে তালাকই বৈধ প্রক্রিয়া। সৃষ্টিগতভাবে সীমিত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের মনে তালাক-পরবর্তী জীবনের বিষয়ে যাতে হতাশা না আসে, সে জন্য আল্লাহ আশ্বাস দিয়েছেন,

“আর যদি তারা উভয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে আল্লাহ প্রত্যেককে তাঁর প্রাচুর্য দ্বারা অভাবমুক্ত করবেন।”
(সূরা নিসা: আয়াত ১৩০)

ইসলাম উপার্জনের দায়িত্ব স্বামীর ওপর দিয়েছে। তবে আধুনিক জীবনে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে অনেক পরিবারে স্ত্রীও উপার্জনে অংশ নেন। সংসার ভেঙে গেলে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সে কারণেই আল্লাহ মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন,

“নিশ্চয় তোমার রব যাকে ইচ্ছা তার জন্য রিজিক প্রশস্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সীমিত করেন।”
(সূরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ৩০)

“এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যে উৎস সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।”
(সূরা আত-তালাক: আয়াত ৩)

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি লেখকের ব্যক্তিগত মতামত ও ব্যাখ্যা। এটি কোরআনে বর্ণিত তালাক-সংক্রান্ত কোনো চূড়ান্ত ধর্মীয় সিদ্ধান্ত নয় এবং কাউকে তালাকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যেও লেখা নয়।

লেখক: মানবিক সংগঠক ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ক লেখক।