গ্যালারির ছোট্ট দর্শক থেকে বিশ্বকাপের তারকা হয়ে উঠছে লামিনে ইয়ামালের ভাই কেইন
- প্রকাশঃ ১১ জুলাই ২০২৬, ১৬:৩০
- / 2
চলতি বিশ্বকাপে স্পেনের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এসেছে গ্যালারিতে বসে থাকা এক ছোট্ট সমর্থক। তিনি মাঠের খেলোয়াড় নন, স্প্যানিশ তারকা লামিনে ইয়ামালের তিন বছর বয়সী সৎ ভাই কেইন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে স্পেনের দাপুটে জয়ের ম্যাচে তার প্রাণবন্ত উদযাপন মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই বিশ্বকাপজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এই শিশুটি।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে স্পেন ৩-০ গোলে এগিয়ে ছিল। ৮৯ মিনিটে মিকেল ওয়ারজাবালের গোলের পর সম্প্রচারকারী টেলিভিশনের ক্যামেরা ঘুরে যায় গ্যালারির দিকে। স্প্যানিশ সমর্থকদের ভিড়ে আনন্দে দু’হাত উঁচু করে ‘ভামোস’ বলে চিৎকার করতে দেখা যায় ছোট্ট কেইনকে। সেই দৃশ্য দ্রুতই ভাইরাল হয়ে যায় এবং স্পেনজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সম্প্রচারকারী টিম তাকে কাকতালীয়ভাবে ক্যামেরায় ধরেনি। ফুটবল অঙ্গনে কেইন ইতোমধ্যেই পরিচিত মুখ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে জন্ম নেওয়া কেইন লামিনে ইয়ামালের মা শেইলা এবানার সন্তান। দুজনের বাবা আলাদা হলেও ইয়ামাল ও কেইনের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে ছোট ভাইয়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ১৮ বছর বয়সী ইয়ামাল।
তিনি বলেন, “ছোট ভাইকে এত খুশি হতে দেখলে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। আমার মা এবং বন্ধুরা সবসময় যে জীবনের স্বপ্ন দেখেছেন, তাদের সেই জীবন যাপন করতে দেখতেও ভালো লাগে।” তিনি আরও বলেন, “আমার ছোট ভাই-ই আমার সব। ওকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। মনে হয় ও যেন আমার নিজের সন্তান।”
একজন ফুটবলার হিসেবে ইয়ামালের জীবনে পারিবারিক বন্ধন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্যারিয়ারের চাপ কিংবা অল্প বয়সে বিশ্বতারকা হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রায়ই নিজের শৈশবের কঠিন সময়ের কথা তুলে ধরেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বার্সেলোনার সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও তিনি নিশ্চিত করেছিলেন, পরিবারের সবাই যেন তার পাশে থাকেন।
সম্প্রতি স্প্যানিশ রেডিও স্টেশন কাদেনা সারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল বলেন, “মায়ের বয়স যখন মাত্র ১৬ বছর, তখন আমার জন্ম হয়। বাবাকেও জীবিকার জন্য রাস্তায় বের হতে হতো। অনেক সময় আমাদের জন্য খাবার জোগাড় করতে রাস্তার পরিত্যক্ত জিনিসপত্রও সংগ্রহ করতে হয়েছে। আমার কাছে জীবনের আসল চাপ ছিল সেটাই। এখন যেটা অনুভব করি, সেটা কোনো চাপই নয়।”
ইয়ামালের ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য, পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই পরিবারের সব ধরনের দায়িত্ব নেওয়াকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সেই কারণেই ছোট ভাই কেইন তার জীবনে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
বার্সেলোনার প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই গ্যালারিতে দেখা যায় কেইনকে। ইউরোপের বিভিন্ন অ্যাওয়ে ম্যাচেও তিনি বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকেন। সেপ্টেম্বরে ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে ইয়ামালের সঙ্গে প্যারিসেও গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে রেড কার্পেটে একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের বল নিয়ে খেলতে খেলতে ক্যামেরার সামনে তার উপস্থিতি দর্শকদের নজর কাড়ে।
স্প্যানিশ ফুটবল অনুসরণকারীদের কাছে কেইনের পরিচিতি অবশ্য নতুন নয়। স্পেন ২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর পরিবারের সঙ্গে মাঠে নেমে শিরোপা উদযাপনে অংশ নিয়েছিল সে। সেই সময় একাধিক ফুটবলারের সঙ্গে তার খুনসুটিও আলোচনায় আসে।
বড় ভাইয়ের জনপ্রিয়তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেইনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছে। ইয়ামাল নিয়মিত ছোট ভাইয়ের সঙ্গে টিকটক নাচ, বাগানে ফুটবল খেলা এবং পারিবারিক নানা মুহূর্তের ভিডিও প্রকাশ করেন। গত মৌসুমে ক্যাম্প ন্যুতে বার্সেলোনার লা লিগা শিরোপা উদযাপনেও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কেইন। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তার নাচ কিংবা বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের নাম বলার ভিডিওও ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
ডিসেম্বরে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে ইয়ামাল দেখিয়েছিলেন, কীভাবে কেইন সবসময় তার একটি ছোট মূর্তি নিয়ে খেলতে পছন্দ করে। এটি কাতালান বড়দিনের ঐতিহ্যবাহী ‘কাগানের’ মূর্তি। বাড়িতে বসে বার্সেলোনার সংগীত গাওয়া, ভাইয়ের নামে উল্লাস করা কিংবা বার্সেলোনা ও অ্যাথলেটিক ক্লাবের একটি লা লিগা ম্যাচের পর দলের মাসকট এবং স্পেন দলের উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামসের সঙ্গে খেলাধুলার ভিডিওও ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে কেইনের জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তার উদযাপনের ভিডিও স্পেনে অসংখ্যবার শেয়ার হয়েছে এবং এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত মিমগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। জাতীয় দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ও এই ভিডিও নিয়ে মন্তব্য করেছেন। ভিডিওটির নিচে এক ব্যবহারকারী ক্যামেরার সামনে থাকা এক স্বর্ণকেশী নারীকে নিয়ে মন্তব্য করলে স্প্যানিশ স্ট্রাইকার বোরহা ইগলেসিয়াস জবাব দিয়ে জানান, তিনি গোলদাতা মিকেল ওয়ারজাবালের মা। বিশ্বকাপে স্পেন দলের খেলোয়াড়দের পরিবারের সদস্যরা একই গ্যালারি থেকে ম্যাচ উপভোগ করেন।
কেইনের মা শেইলা এবানার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও নিয়মিত দেখা যায় ছোট্ট এই শিশুকে। সাত লাখের বেশি অনুসারী থাকা ওই অ্যাকাউন্টে পারিবারিক নানা মুহূর্তের পাশাপাশি বিভিন্ন স্পনসর্ড কনটেন্টেও তার উপস্থিতি রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিওতে বার্সেলোনার উপকূলীয় শহর প্রেমিয়া দে মারের একটি সুশি রেস্তোরাঁয়ও দেখা গেছে তাকে।
ইয়ামালের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ইতোমধ্যেই কেইনের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সহযোগিতার বিষয়ে যোগাযোগ শুরু করেছে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে স্পেন। সেই ম্যাচেও গ্যালারিতে ছোট ভাই কেইনের উপস্থিতি এবং তার স্বতঃস্ফূর্ত উদযাপন আবারও ক্যামেরাবন্দী হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন ফুটবলপ্রেমীরা।























