বইমজুরের জোছনা বিলাস
- প্রকাশঃ ১২ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫৬
- / 11
মাটির প্রদীপের আলো খুব বেশি দূর ছড়ায় না। কিন্তু সেই প্রদীপের সলতে যদি কেউ নিজের শ্রম, ত্যাগ আর স্বপ্ন দিয়ে জ্বালিয়ে রাখেন, তাহলে তার আলো একসময় একটি জনপদকেও আলোকিত করতে পারে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার প্রত্যন্ত সুহাতা গ্রামের ‘গুঞ্জন পাঠাগার’ এমনই এক আলোর গল্প। এই পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা স্বপন মিয়ার জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে, সীমাহীন অভাবও জ্ঞানচর্চার পথ থামিয়ে দিতে পারে না।
মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবাকে হারান স্বপন মিয়া। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে মা রাজিয়া খাতুনের কাঁধে। তিন সন্তানকে মানুষ করতে তিনি দিনমজুরের কাজ করেছেন। বড় দুই ছেলে রিকশা চালিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে ছোট ছেলে স্বপনের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া পরিবারের জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
পরিবারের সদস্যরা যখন তাকে পড়াশোনা ছেড়ে উপার্জনের পরামর্শ দেন, তখন স্বপন ভিন্ন পথ বেছে নেন। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ছাড়েননি। সেই স্বপ্নে সবচেয়ে বড় সহযাত্রী ছিলেন তার মা। নিজের বসতভিটার সোয়া দুই শতাংশ জমি ছেলের নামে লিখে দেন তিনি। পাশাপাশি একটি এনজিও থেকে আট হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছেলের স্বপ্নপূরণে এগিয়ে আসেন।
২০০৪ সালের ৩০ মার্চ একটি টিনের ছোট ঘরে মাত্র তিনটি বই নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘গুঞ্জন পাঠাগার’। স্লোগান ছিল, এসো বই পড়ি, আলোকিত জীবন গড়ি।’
পাঠাগার চালিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। জীবিকার প্রয়োজনে কখনো দিনমজুর হিসেবে কাজ করেছেন, আবার কখনো রিকশা চালিয়েছেন স্বপন। কঠোর পরিশ্রমের আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করেছেন বই কেনার পেছনে। ২২ বছরের সেই নিরলস প্রচেষ্টায় পাঠাগারের সংগ্রহ এখন প্রায় ১৫ হাজার বই।

গুঞ্জন পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা স্বপন মিয়া পাঠ দান কর্মসূচি । ছবি: লেখকের সৌজন্যে
অভাবের মধ্যেও নিজের পড়াশোনা থামিয়ে দেননি তিনি। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি কসবার বায়েক শাহ আলম কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি একজন গবেষক, প্রাবন্ধিক, কবি, সাহিত্যিক, ছন্দকার, গীতিকার ও সুরকার। এখন পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২০টি।
তবে শিক্ষকতার চাকরি তার কাছে কেবল পেশা নয়। নিজের আয়ের বড় একটি অংশ তিনি নিয়মিত পাঠাগারের উন্নয়নে ব্যয় করেন। ২০২২ সালে মায়ের মৃত্যুর পর গুঞ্জন পাঠাগারই যেন হয়ে উঠেছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও ভালোবাসার ঠিকানা।
আজ সুহাতা গ্রামের অসংখ্য শিক্ষার্থীর জন্য পাঠাগারটি একটি নির্ভরতার জায়গা। প্রতি শুক্রবার এখানে বই পড়া, আলোচনা এবং সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঠাগার থেকে বই পড়ে অনেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং সরকারি চাকরিতে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন।
নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে স্বপন মিয়া বলেন, “আমার মতো অনেক শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে বই কিনতে পারে না, পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। তাদের জন্যই এই গুঞ্জন পাঠাগার। আমি না থাকলেও পৃথিবীর কিছু থেমে থাকবে না। কিন্তু এই পাঠাগার বন্ধ হয়ে গেলে পুরো গ্রামেরই ক্ষতি হবে।”
স্বপন মিয়ার গল্প কেবল একজন মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস নয়; এটি একটি গ্রামের পরিবর্তনের গল্প। সীমিত সামর্থ্য, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর বিশ্বাস কীভাবে একটি সমাজকে বদলে দিতে পারে, গুঞ্জন পাঠাগার তারই একটি অনন্য উদাহরণ।
























