ঢাকা ১১:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টার শোক

  • প্রকাশঃ ১০:২৩:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 41

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

বিএনপি মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় বলা হয়, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ সকাল ৬টায় ফজরের ঠিক পরে ইন্তেকাল করেছেন। আমরা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং সকলের নিকট তার বিদেহী আত্মার জন্য দোয়া চাচ্ছি।’

গত ২৩ নভেম্বর থেকে তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আইসিইউতে থাকা অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল বলে জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদার। শৈশবে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবরণের পর দলের সংকটময় সময়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন। আপসহীন আন্দোলনের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এই সময়ে সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দী থাকতে হয়।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

তার শাসনামলে শিক্ষা খাতে নেওয়া হয় একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা ও উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু করা হয়। পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে না পারলেও তিনি ১১৬টি আসন নিয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আবারও নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

২০০৫ সালে মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯তম অবস্থানে স্থান দেয়। এছাড়া ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট গণতন্ত্রের প্রতি অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ উপাধিতে ভূষিত করে।

২০১৮ সালে একটি মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিনি কারাবন্দী হন। তবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং আইন বিশেষজ্ঞরা এ মামলার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর পর্যায়ক্রমে সব মামলায় তিনি খালাস পান।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এমন একজন নেতা, যিনি ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যে কয়টি আসনে নির্বাচন করেছেন, তার প্রতিটিতেই বিজয়ী হয়েছেন—যা একটি অনন্য রেকর্ড।

তার ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হলো। শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

শেয়ার করুন

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টার শোক

প্রকাশঃ ১০:২৩:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

বিএনপি মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় বলা হয়, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ সকাল ৬টায় ফজরের ঠিক পরে ইন্তেকাল করেছেন। আমরা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং সকলের নিকট তার বিদেহী আত্মার জন্য দোয়া চাচ্ছি।’

গত ২৩ নভেম্বর থেকে তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আইসিইউতে থাকা অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল বলে জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদার। শৈশবে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবরণের পর দলের সংকটময় সময়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন। আপসহীন আন্দোলনের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এই সময়ে সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দী থাকতে হয়।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

তার শাসনামলে শিক্ষা খাতে নেওয়া হয় একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা ও উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু করা হয়। পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে না পারলেও তিনি ১১৬টি আসন নিয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আবারও নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

২০০৫ সালে মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯তম অবস্থানে স্থান দেয়। এছাড়া ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট গণতন্ত্রের প্রতি অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ উপাধিতে ভূষিত করে।

২০১৮ সালে একটি মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিনি কারাবন্দী হন। তবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং আইন বিশেষজ্ঞরা এ মামলার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর পর্যায়ক্রমে সব মামলায় তিনি খালাস পান।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এমন একজন নেতা, যিনি ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যে কয়টি আসনে নির্বাচন করেছেন, তার প্রতিটিতেই বিজয়ী হয়েছেন—যা একটি অনন্য রেকর্ড।

তার ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হলো। শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”