ইমিগ্রেশন নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ধাক্কা খেলেও বাংলাদেশিদের জন্য কেন বদল এলো না?
- প্রকাশঃ ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৯
- / 3
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি ফেডারেল আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বিতর্কিত অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তী আদেশ (প্রিলিমিনারি ইনজাংশন) জারি করেছে। তবে এই রায়ে বাংলাদেশিদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো আইনি সুবিধা তৈরি হয়নি, কারণ বাংলাদেশ এই মামলার আওতাভুক্ত দেশগুলোর তালিকায় নেই।
গত ৬ জুলাই ওহাইওর কলাম্বাসে ফেডারেল জেলা বিচারক আলজেনন এল. মার্বলি ২৫ জন অভিবাসীর করা এক মামলায় এই আদেশ দেন। বাদীরা অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা (USCIS) তাদের জন্মদেশকে একটি নেতিবাচক বিবেচ্য বিষয় হিসেবে ব্যবহার করে কাজের অনুমতি, গ্রিন কার্ডসহ বিভিন্ন অভিবাসন সুবিধার আবেদন অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রেখেছে।
রায়ে বিচারক স্পষ্ট করেন, মামলাটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রবেশাধিকার সীমিত করার সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ইউএসসিআইএস আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে এমন একটি প্রশাসনিক নীতি গ্রহণ করতে পারে কি না, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থানরত ব্যক্তিদের আবেদন জাতীয়তার ভিত্তিতে আটকে রাখা হয়।
৬৯ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিও প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তাকে বিচারিক পর্যালোচনা এড়ানোর “কবচ” হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, ক্যালিফোর্নিয়া, ম্যাসাচুসেটস, আরকানসাস, মেরিল্যান্ড, ইন্ডিয়ানা এবং সম্প্রতি রোড আইল্যান্ডের আদালতও একই ধরনের নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসনের বিপক্ষে রায় দিয়েছে।
রায়ের একটি অংশে বিচারক ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অতীত বক্তব্যও উল্লেখ করেন। বিশেষ করে আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান, দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়ার অভিবাসীদের নিয়ে দেওয়া বিভিন্ন মন্তব্য এবং ওহাইওর স্প্রিংফিল্ডে হাইতিয়ান অভিবাসীদের নিয়ে বিতর্কিত দাবির প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। তবে বিচারক স্পষ্ট করেন, এসব বক্তব্য তাঁর সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি নয়; এগুলো কেবল প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মূল সিদ্ধান্তের ভিত্তি হলো ইউএসসিআইএস প্রশাসনিক পদ্ধতি আইন (Administrative Procedure Act) এবং অভিবাসন আইনের অধীনে তাদের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে।
মামলার ২৫ জন বাদীর মধ্যে রয়েছেন মিয়ানমার (বার্মা), কানাডা, ইরান, নাইজেরিয়া, সিরিয়া, তানজানিয়া ও ভেনেজুয়েলার নাগরিক। তারা বিভিন্ন পেশার মানুষ, যার মধ্যে হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট, নিবন্ধিত নার্স, ক্যান্সার গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং প্রকৌশলীও আছেন।
তবে আদালতের এই আদেশ ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেনি। এটি কেবল ওই ২৫ জন বাদীর ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে নীতিটি প্রয়োগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যতক্ষণ না মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়। একই সঙ্গে সরকারকে ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে, কীভাবে তারা এই আদেশ বাস্তবায়ন করছে।
রায় ঘোষণার একদিন পর পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে আপিলের ঘোষণা দেয়নি। তবে একাধিক আদালতে একই ধরনের মামলায় প্রশাসনের বিপক্ষে রায় আসায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকার ষষ্ঠ সার্কিট কোর্ট অব আপিলে এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
সম্প্রতি ম্যাসাচুসেটসের বোস্টনে ফেডারেল বিচারক জুলিয়া কোবিকও প্রায় ২০টি দেশের ২০০ জন অভিবাসীর একটি পৃথক মামলায় একই ধরনের নীতিকে বৈষম্যমূলক ও বেআইনি বলে মন্তব্য করেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতিকে ঘিরে আইনি বিরোধ আরও বিস্তৃত হচ্ছে এবং বিষয়টি শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত পর্যন্ত যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশিদের জন্য এই রায়ের অর্থ কী
এই মামলাটি মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের ২০২৫ সালে ঘোষিত ৩৯টি দেশের পূর্ণ বা আংশিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইউএসসিআইএস নীতি নিয়ে। এই তালিকায় ইরান, সিরিয়া ও মিয়ানমারসহ কয়েকটি দেশ রয়েছে। বাংলাদেশ এই ৩৯টি দেশের তালিকায় নেই।
তবে বাংলাদেশ অন্য একটি পৃথক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আওতায় রয়েছে। ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি নীতির অধীনে “পাবলিক চার্জ” বা সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার আশঙ্কার যুক্তিতে ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা (ইমিগ্র্যান্ট ভিসা) প্রক্রিয়াকরণ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ সেই ৭৫টি দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
এই স্থগিতাদেশ বিদেশে অবস্থান করে নতুন অভিবাসী ভিসার আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পর্যটন, শিক্ষার্থী বা কর্মসংস্থানভিত্তিক নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট নীতি প্রযোজ্য নয়।
ফলে ওহাইওর এই রায় সরাসরি বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য কোনো আইনি পরিবর্তন আনেনি। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করেছে। আদালতগুলো ধারাবাহিকভাবে এমন অবস্থান নিচ্ছে যে, কেবল জাতীয়তার ভিত্তিতে অভিবাসন সুবিধা আটকে রাখার প্রশাসনিক নীতির যথেষ্ট আইনি ভিত্তি নেই।
একই ধরনের যুক্তিতে চলমান অন্যান্য মামলা, বিশেষ করে বোস্টনের মামলার ভবিষ্যৎ রায়, বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের সরাসরি আইনি সুবিধা পেতে হলে পৃথক মামলা অথবা আরও বিস্তৃত পরিসরের আদালতের রায়ের প্রয়োজন হতে পারে।

























