ঢাকা ০৫:২৭ রবিবার, Tue, ৩০ Jun ২০২৬

জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব বহাল, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ খারিজ করল সুপ্রিম কোর্ট

প্রজন্ম কথা ডেস্ক
  • প্রকাশঃ ০৩:৩২:২৫ রবিবার, ৩০ জুন ২০২৬
  • / 5

গ্রাফিক্স: প্রজন্ম কথা


যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেওয়া নিম্ন আদালতের স্থগিতাদেশ বহাল রেখেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার ৬-৩ ভোটের রায়ে আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী আদেশ কার্যকর করার পথ আপাতত বন্ধ রাখে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্বের দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক অধিকার বহাল থাকছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, চলতি বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি আদালতে আইনি বাধার মুখে পড়ল। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপসংক্রান্ত উদ্যোগ নিয়েও সুপ্রিম কোর্টে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ক্ষমতায় ফিরে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। ওই আদেশে বলা হয়, যদি কোনো শিশুর জন্মের সময় তার বাবা-মায়ের কেউই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা (গ্রিন কার্ডধারী) না হন, তাহলে সেই শিশুকে জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।

এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে করা মামলায় বাদীপক্ষ যুক্তি দেয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারার পরিপন্থী। ওই ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী এবং দেশটির এখতিয়ারের আওতাভুক্ত সব ব্যক্তি মার্কিন নাগরিক। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের পক্ষে রায় লিখে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, ১৮৯৮ সালের ঐতিহাসিক ইউনাইটেড স্টেটস বনাম ওং কিম আর্ক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

রবার্টস লেখেন, “গত ১২৮ বছর ধরে আমরা ধারাবাহিকভাবে এই নীতিই অনুসরণ করেছি যে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এবং দেশটির আইনি এখতিয়ারের আওতায় থাকা সব শিশুই নাগরিকত্বের অধিকারী। আজ সেই অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার কোনো কারণ আমরা দেখছি না।”

তিনি আরও বলেন, নাগরিকত্ব ধারা ব্যাখ্যায় ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের পক্ষে পর্যাপ্ত সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। বাদীপক্ষের দাবি ছিল, ট্রাম্পের নির্দেশনা কার্যকর হলে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ নবজাতকের নাগরিকত্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত। পাশাপাশি লাখো পরিবারকে তাদের নবজাতকের নাগরিকত্ব প্রমাণে অতিরিক্ত আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হতো।

মামলাটি নিউ হ্যাম্পশায়ারে একদল অভিভাবক ও তাদের সন্তানদের পক্ষে শ্রেণিভিত্তিক (ক্লাস অ্যাকশন) মামলা হিসেবে দায়ের করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, সংবিধানে ব্যবহৃত “যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের আওতাভুক্ত” বাক্যাংশের অর্থ কেবল যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নয়। তাদের মতে, নাগরিকত্ব পেতে হলে বাবা-মায়ের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি স্থায়ী আনুগত্য এবং বৈধ স্থায়ী বসবাস থাকতে হবে। এ কারণে অবৈধভাবে অবস্থানরত অভিবাসী কিংবা অস্থায়ী ভিসাধারীদের সন্তানদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত নয়।

মামলার শুনানিতে প্রশাসনের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল ডি. জন সাওয়ার বলেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুযোগকে কেন্দ্র করে “বার্থ ট্যুরিজম” বা সন্তানকে নাগরিকত্ব পাইয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার একটি শিল্প গড়ে উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তার কাছে নেই বলেও তিনি আদালতে স্বীকার করেন।

রায়ের পর ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টা বলেন, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতিকে পুনর্ব্যক্ত করেছে, যেখানে জন্মস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি শিশুর আইনের দৃষ্টিতে সমান অধিকার রয়েছে। নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসও রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক নিশ্চয়তা, যা বহু প্রজন্ম ধরে দেশটির পরিচয়ের অংশ।

তবে অভিবাসনসংক্রান্ত অন্যান্য বেশ কয়েকটি বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিছু মানবিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাতিল, আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশে বিধিনিষেধ এবং অভিবাসন অভিযান সম্প্রসারণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। মঙ্গলবারের এই রায়ের মাধ্যমে অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সুপ্রিম কোর্টের চলতি মেয়াদের রায় ঘোষণা কার্যক্রম শেষ হয়েছে।

শেয়ার করুন

জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব বহাল, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ খারিজ করল সুপ্রিম কোর্ট

প্রকাশঃ ০৩:৩২:২৫ রবিবার, ৩০ জুন ২০২৬

গ্রাফিক্স: প্রজন্ম কথা


যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেওয়া নিম্ন আদালতের স্থগিতাদেশ বহাল রেখেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার ৬-৩ ভোটের রায়ে আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী আদেশ কার্যকর করার পথ আপাতত বন্ধ রাখে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্বের দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক অধিকার বহাল থাকছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, চলতি বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি আদালতে আইনি বাধার মুখে পড়ল। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপসংক্রান্ত উদ্যোগ নিয়েও সুপ্রিম কোর্টে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ক্ষমতায় ফিরে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। ওই আদেশে বলা হয়, যদি কোনো শিশুর জন্মের সময় তার বাবা-মায়ের কেউই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা (গ্রিন কার্ডধারী) না হন, তাহলে সেই শিশুকে জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।

এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে করা মামলায় বাদীপক্ষ যুক্তি দেয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারার পরিপন্থী। ওই ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী এবং দেশটির এখতিয়ারের আওতাভুক্ত সব ব্যক্তি মার্কিন নাগরিক। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের পক্ষে রায় লিখে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, ১৮৯৮ সালের ঐতিহাসিক ইউনাইটেড স্টেটস বনাম ওং কিম আর্ক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

রবার্টস লেখেন, “গত ১২৮ বছর ধরে আমরা ধারাবাহিকভাবে এই নীতিই অনুসরণ করেছি যে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এবং দেশটির আইনি এখতিয়ারের আওতায় থাকা সব শিশুই নাগরিকত্বের অধিকারী। আজ সেই অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার কোনো কারণ আমরা দেখছি না।”

তিনি আরও বলেন, নাগরিকত্ব ধারা ব্যাখ্যায় ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের পক্ষে পর্যাপ্ত সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। বাদীপক্ষের দাবি ছিল, ট্রাম্পের নির্দেশনা কার্যকর হলে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ নবজাতকের নাগরিকত্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত। পাশাপাশি লাখো পরিবারকে তাদের নবজাতকের নাগরিকত্ব প্রমাণে অতিরিক্ত আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হতো।

মামলাটি নিউ হ্যাম্পশায়ারে একদল অভিভাবক ও তাদের সন্তানদের পক্ষে শ্রেণিভিত্তিক (ক্লাস অ্যাকশন) মামলা হিসেবে দায়ের করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, সংবিধানে ব্যবহৃত “যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের আওতাভুক্ত” বাক্যাংশের অর্থ কেবল যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নয়। তাদের মতে, নাগরিকত্ব পেতে হলে বাবা-মায়ের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি স্থায়ী আনুগত্য এবং বৈধ স্থায়ী বসবাস থাকতে হবে। এ কারণে অবৈধভাবে অবস্থানরত অভিবাসী কিংবা অস্থায়ী ভিসাধারীদের সন্তানদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত নয়।

মামলার শুনানিতে প্রশাসনের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল ডি. জন সাওয়ার বলেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুযোগকে কেন্দ্র করে “বার্থ ট্যুরিজম” বা সন্তানকে নাগরিকত্ব পাইয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার একটি শিল্প গড়ে উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তার কাছে নেই বলেও তিনি আদালতে স্বীকার করেন।

রায়ের পর ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টা বলেন, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতিকে পুনর্ব্যক্ত করেছে, যেখানে জন্মস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি শিশুর আইনের দৃষ্টিতে সমান অধিকার রয়েছে। নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসও রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক নিশ্চয়তা, যা বহু প্রজন্ম ধরে দেশটির পরিচয়ের অংশ।

তবে অভিবাসনসংক্রান্ত অন্যান্য বেশ কয়েকটি বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিছু মানবিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাতিল, আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশে বিধিনিষেধ এবং অভিবাসন অভিযান সম্প্রসারণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। মঙ্গলবারের এই রায়ের মাধ্যমে অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সুপ্রিম কোর্টের চলতি মেয়াদের রায় ঘোষণা কার্যক্রম শেষ হয়েছে।