নিউইয়র্ক পোস্টের ধারাবাহিক সমালোচনার মধ্যেও জনপ্রিয়তা বাড়ছে মেয়র জোহরান মামদানির
- প্রকাশঃ ১৪ জুলাই ২০২৬, ১০:১৬
- / 10
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে নিয়ে ডানপন্থী সংবাদপত্র নিউইয়র্ক পোস্ট গত কয়েক মাস ধরে প্রায় প্রতিদিনই সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। কখনো তাকে কমিউনিস্ট, কখনো পুলিশবিরোধী, কখনো ইহুদিবিদ্বেষী, আবার কখনো ধনীদের শহর ছাড়তে বাধ্য করা একজন রাজনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এসব সমালোচনার মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা কমার পরিবর্তে বেড়েছে বলে বিভিন্ন জরিপ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের শেষ দিকে মেয়র পদে নির্বাচনী প্রচার শুরু করার পর থেকেই রুপার্ট মারডকের মালিকানাধীন নিউইয়র্ক পোস্ট ধারাবাহিকভাবে মামদানিকে লক্ষ্য করে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। তবে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পর দেখা যাচ্ছে, তার রাজনৈতিক প্রভাব ও জনসমর্থন আরও বিস্তৃত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মামদানির সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থীদের মধ্যে তিনজনই জুন মাসের প্রাইমারি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন, যা তার রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। লেখক ও কলামিস্ট রস বারকান, যার নতুন বই The Revolutionary: Zohran Mamdani and the Remaking of American Politics আগামী অক্টোবরে প্রকাশিত হবে, বলেন, নিউইয়র্ক পোস্ট দীর্ঘদিন ধরেই শহরের রাজনীতিতে প্রভাবশালী। তবে মামদানির আবির্ভাবের পর প্রথমবারের মতো এমন একজন রাজনীতিক দেখা গেছে, যিনি সংবাদপত্রটির প্রভাবকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছেন।
জুনের শেষ দিকে প্রকাশিত সিয়েনা ইউনিভার্সিটির এক জরিপে দেখা যায়, গত দুই মাসে মামদানির জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। জরিপ অনুযায়ী, নিউইয়র্কের ৫৮ শতাংশ বাসিন্দা তার কার্যক্রমকে সমর্থন করেছেন। বিপক্ষে মত দিয়েছেন ২৬ শতাংশ। এই অনুমোদনের হার রাজ্যের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সামগ্রিক জনপ্রিয়তার চেয়েও বেশি।
তবে সমালোচনার মাত্রা কমেনি। চলতি সপ্তাহের সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত মাত্র তিন দিনেই নিউইয়র্ক পোস্টে “জোহরান মামদানি” ট্যাগে ২৯টি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে ইসরায়েল ইস্যুতে তার অবস্থান, সরকারি সুপারমার্কেট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা, সরকারি বিদ্যালয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ, এক পুলিশ কর্মকর্তার নামের বানান, নিউইয়র্কের অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকার মানচিত্রে “লিটল ইতালি” না থাকা এবং এমনকি তার স্ত্রীর ছুটিতে যাওয়া নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে।
নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র বিল ডি ব্লাসিওর সময়েও নিউইয়র্ক পোস্ট ধারাবাহিক সমালোচনা চালিয়েছিল। ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করলেও তার বেশ কিছু নীতি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। রস বারকানের মতে, ডি ব্লাসিওর ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক পোস্ট দ্রুত একটি কার্যকর রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা তৈরি করতে পেরেছিল। কিন্তু মামদানির ক্ষেত্রে এখনো তেমন কোনো সমালোচনার ধারা তৈরি করতে পারেনি, যা সাধারণ ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
তিনি বলেন, মামদানি যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ না করায় সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করতে পারবেন না। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে তোলা কঠিন। একই সময়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। মিডিয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থা মিডিয়া ম্যাটার্স ফর আমেরিকা-এর সভাপতি অ্যাঞ্জেলো কারুসোনে বলেন, নিউইয়র্ক পোস্ট বর্তমানে মামদানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ছুড়ে দিচ্ছে, তবে সেগুলোর কোনোটিই উল্লেখযোগ্যভাবে জনমত প্রভাবিত করতে পারেনি।
তার ভাষায়, মামদানি গণমাধ্যম ব্যবহারে দক্ষ। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নিজস্ব যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে যান। ফলে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হয় না এবং সমালোচনার প্রভাবও অনেকাংশে কমে যায়। নির্বাচনের আগে নিউইয়র্ক পোস্টে একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, মামদানি নির্বাচিত হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কোটিপতিরা নিউইয়র্ক ছেড়ে চলে যাবেন, অপরাধ বাড়বে এবং শহর দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, যা দেখায় যে বড় পরিসরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শহর ছেড়ে যাচ্ছে। বরং ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে আগের প্রান্তিকের তুলনায় নিউইয়র্কে অফিস ভাড়া নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। অ্যাঞ্জেলো কারুসোনে বলেন, অতিরঞ্জিত পূর্বাভাস বাস্তবে প্রতিফলিত না হওয়ায় সেসব সমালোচনার কার্যকারিতা কমে গেছে। তার মতে, মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে যেটা অনুভব করছে, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশিত সমালোচনার সঙ্গে মিলছে না।
রস বারকানের ভাষায়, নিউইয়র্ক পোস্ট এখনো মামদানিকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার কার্যকর কৌশল খুঁজে পায়নি। তিনি বলেন, সংবাদপত্রটি প্রতিদিনই মামদানিকে আক্রমণ করছে। এতে পাঠকসংখ্যা বাড়তে পারে, তবে রাজনৈতিকভাবে তার অবস্থান দুর্বল করার মতো কোনো প্রভাব এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। অনেক নিউইয়র্কবাসী এসব সমালোচনাকে গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে যাচ্ছেন।



























